দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দুই দশক পর ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবারের মধ্যে দেশটিতে থাকা শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে। এ ঘটনাকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা বিজয় হিসেবে দেখছে। দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে ইরাকে প্রায় সাড়ে চার হাজার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে চূড়ান্ত হওয়া এই প্রত্যাহার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরানে-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইরাকে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি ইসলামিক স্টেটসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শত্রুরাও আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গবেষণা করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়ে ইরান কৌশলগতভাবে লাভবান হবে। কারণ, ইরাকে বহু বছর ধরে তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় যে সামরিক উপস্থিতি কাজ করেছে, তা আর থাকবে না।
তার মতে, ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ও সম্মানিত ইরাকিদের ঐতিহাসিক বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পের পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং দখলদারিত্বের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার ব্যর্থতা উদযাপন করা হবে।
তবে ইরাকের কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতার মতে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়টি এখনও উপযুক্ত নয়। ফালুজার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরো দায়িত্ব নেওয়ার জন্য দেশটি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তার মতে, সবাই ইরাকের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়, কিন্তু এভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট চলে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিই ইরাকিদের উদ্বেগের কারণ।
২০০৩ সালে সুন্নি মুসলিম শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে দেশটি দখল করে শিয়াপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ দমনে লড়াই করে মার্কিন বাহিনী। ২০১১ সালের শেষ দিকে তারা ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। এর প্রায় তিন বছর পর ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করতে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দিতে আবারও মার্কিন সেনা দেশটিতে ফিরে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখা একমাত্র দেশ ছিল। ইরাকের ভূখণ্ডকে দুই পক্ষের সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সময়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা করে।
চলতি বছরের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় এক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।
ইরান মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের বিজয় হিসেবে দেখছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও অঞ্চলটি ছেড়ে গেলে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
এদিকে ইসলামিক স্টেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও উত্তরাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা। প্রায় এক দশক আগে ইসলামিক স্টেটের কথিত খেলাফত পরাজিত হলেও সংগঠনটির স্লিপার সেল এখনও সক্রিয় রয়েছে।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, সরবরাহ সহায়তা ও ড্রোনের অভাবে ইসলামিক স্টেট পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। তার দাবি, সেপ্টেম্বরের শেষে আন্তর্জাতিক জোট ইরাক ছাড়বে—এমন ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে ইসলামিক স্টেটের স্লিপার সেলগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। এতে সংগঠনটির যোদ্ধাদের মনোবলও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইসলামিক স্টেটের একটি সন্দেহভাজন সেল। ইরাকের চারজন নিরাপত্তা ও সেনা কর্মকর্তার মতে, এ পরিকল্পনা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া শূন্যতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটির সক্ষমতার বিষয়টি সামনে এনেছে।
কিরকুকের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, ইসলামিক স্টেট এখনও শক্তিশালী এবং রক্তক্ষয়ী হামলা চালাতে সক্ষম—এমন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এমএস/