দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার করে ওষুধ ও জীবনবিজ্ঞানে গবেষণার পরিধি বাড়াতে গোপনে একটি পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় স্থাপিত এই ল্যাবে কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সরাসরি জৈবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
অ্যানথ্রপিকের লাইফ সায়েন্স বিভাগের প্রধান এরিক কডেরার-আব্রামস মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েট ল্যাব থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ওয়েট ল্যাব বলতে এমন পরীক্ষাগারকে বোঝায়, যেখানে জীববিজ্ঞানভিত্তিক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
তিনি বলেন, জীববিজ্ঞানে কাজ করতে হলে বাস্তব পরীক্ষাগারে গবেষণাই এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অ্যানথ্রপিক নিজেদের স্থাপনায় কিছু কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরের অংশীদারদের সঙ্গেও কাজ করছে।
তবে পরে প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানান, অ্যানথ্রপিকের ল্যাবটি নির্দিষ্টভাবে ওষুধ আবিষ্কারের জন্য নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।
অ্যানথ্রপিকের লক্ষ্য হলো এমন কিছু বিরল ও অবহেলিত রোগের চিকিৎসা উন্নয়নে কাজ করা, যেসব ক্ষেত্রে প্রচলিত ওষুধ কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে আগ্রহ দেখায় না। তবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ওষুধ সফলভাবে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সাধারণত নতুন ওষুধের বড় একটি অংশ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেইয়ের জন্য এই উদ্যোগটি ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি এক প্রবন্ধে তিনি জানান, একটি রোগে তার বাবা মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর সেই রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছিল।
কডেরার-আব্রামস বলেন, অ্যানথ্রপিকের লক্ষ্য হলো শক্তিশালী এআই এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তা বিশ্বের উপকারে আসে। জীবনবিজ্ঞান খাতেই তারা এআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখছেন বলে জানান তিনি।
অন্য অনেক বায়োটেক প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যানথ্রপিকও গবেষণাগারের কাজ স্বয়ংক্রিয় করার দিকে এগোচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ক্লদ এআই ব্যবহার করে রোবটের মাধ্যমে সীমিত মানব হস্তক্ষেপে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার জন্য মানুষের তদারকি ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক।
এর মধ্যেই এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহে অ্যানথ্রপিকের কয়েকজন গবেষক সতর্ক করেছেন, এআই ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, তাদের এআই ব্যবস্থাগুলোকে জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারের সম্ভাব্য উদাহরণ তারা শনাক্ত করেছে।
একই সময়ে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে জীববিজ্ঞানে এআই ব্যবহারের প্রসার এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি—দুই বিষয়ই একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
কডেরার-আব্রামস বলেন, জীবনবিজ্ঞানভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে তারা এমনভাবে এআই মডেল উন্নত করার চেষ্টা করছেন, যাতে ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত হয় এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে ঝুঁকি কমানো যায়।
জুনে সান ফ্রান্সিসকোর এক অনুষ্ঠানে অ্যানথ্রপিকের পক্ষ থেকে ওষুধ নিয়ে নিজস্ব গবেষণা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, প্রচলিত ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় নয়—এমন রোগের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণায় তারা কাজ করতে চায়।
এরপর প্রতিষ্ঠানটি ক্লদ সায়েন্স নামের একটি সফটওয়্যার চালু করে। পাশাপাশি ওষুধ উন্নয়নসংক্রান্ত প্রযুক্তি তৈরির জন্য কোয়েফিশিয়েন্ট বায়ো নামের একটি স্টার্টআপ অধিগ্রহণ করেছে অ্যানথ্রপিক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অধিগ্রহণের মূল্য প্রায় ৪০ কোটি ডলার বলা হলেও অ্যানথ্রপিক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
কডেরার-আব্রামস জানান, দ্রুত কাজ করা এবং জীববিজ্ঞানের বাস্তব গবেষণায় সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ল্যাবের কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। যেসব কাজ বাইরে করানো বেশি কার্যকর, সেগুলো অবশ্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হবে।
অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ল্যাবের সরঞ্জাম ও অন্যান্য কার্যক্রমের ক্রয়প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য দক্ষ ব্যক্তির খোঁজ করা হয়েছে। আরেকটি পদে প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড বিশ্লেষণে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য জীবনবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে বহুগুণ দ্রুত করা।
অ্যানথ্রপিকের ধারণা, এআই এমন কিছু রোগের চিকিৎসা উন্নয়নের পথ সহজ করতে পারে, যেগুলোকে এতদিন চিকিৎসার দৃষ্টিতে অত্যন্ত কঠিন বা প্রায় অচিকিৎসাযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে জটিল অ্যান্টিবডি তৈরির মতো ক্ষেত্রে এআই গবেষণার গতি বাড়াতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে কোন কোন রোগ নিয়ে অ্যানথ্রপিক কাজ করছে এবং এ পর্যন্ত তাদের অগ্রগতি কতটা, তা স্পষ্ট নয়। কোনো সম্ভাব্য ওষুধের অণু শনাক্ত হওয়ার পরও মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালিয়ে সেটিকে বাজারে আনতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এ পর্যায়ের কাজ এখনো অ্যানথ্রপিকের আওতায় নেই।
জীববিজ্ঞান গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি এআইয়ের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য আগস্টে মডেল হার্ডওয়্যার স্ট্যান্ডার্ডও চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে রোশের জেনেনটেক, ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইব ও নোভো নরডিস্কের মতো বড় ওষুধ কোম্পানিকে এআইভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ও প্রযুক্তি দিচ্ছে অ্যানথ্রপিক।
তবে এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সামনে আস্থার প্রশ্নও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ওষুধ কোম্পানিগুলো আশঙ্কা করতে পারে যে অ্যানথ্রপিক তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ওষুধ কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য জানতে পারে। অ্যানথ্রপিক অবশ্য গ্রাহকদের তথ্য আলাদা রাখার ব্যবস্থা করেছে।
কডেরার-আব্রামস বলেন, প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অ্যানথ্রপিক আপাতত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করছে না। এমন ক্ষেত্রেই তারা কাজ করতে চাইছে, যেখানে শিল্পখাতের প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্তভাবে কাজ করছে না।
এমএস/