দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানপন্থি যোদ্ধাদের একের পর এক হামলার পর সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির পবিত্র নগরী মক্কা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জেদ্দাসহ বিস্তৃত এলাকায় এ সতর্কতা জারি করা হয়।
তবে সতর্কতাগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রক্ষেপণাস্ত্র সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। হামলার দায়ও কেউ স্বীকার করেনি।
গত সপ্তাহে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার পর মঙ্গলবারের সতর্কতাই ছিল সৌদি আরবে সবচেয়ে বিস্তৃত। বিশেষ করে মক্কায় এই যুদ্ধের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। শহরটিতে মুসলমানদের পবিত্রতম ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর অবস্থান রয়েছে।
ইয়েমেনভিত্তিক ইরানপন্থি হুথিরা গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি বড় হামলার দাবি করেছে। সোমবার দেশটির একটি বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবিও করে তারা। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার জবাবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পরিবহনপথ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানপন্থি ইরাকভিত্তিক একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে রিয়াদ। হামলায় আরব মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে লড়াই করা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, সোমবার সৌদি আরবে হুথিদের হামলায় ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে ইরানপন্থি যোদ্ধারা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে একটি দ্বীপ দখল করে নেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন এই যুদ্ধক্ষেত্র যুক্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে তেহরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি ও ইয়েমেনি বিমানবাহিনী হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। ঐতিহাসিক লোহিত সাগরবন্দর মোক্কার কাছেও হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহে বন্দরটি দখলে নেয় হুথিরা।
ইয়েমেনি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, লোহিত সাগরের তীরবর্তী দেশটির পশ্চিম উপকূলের প্রায় পুরো এলাকাতেই এখন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে হুথিরা।
এক ইয়েমেনি কর্মকর্তা বলেন, হুথিদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। জবাবে তারা সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আরও বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি দেশটির উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ছয় মাস ধরে যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হওয়ায় পাইপলাইনটি সৌদির প্রধান রপ্তানি পথ হয়ে উঠেছিল।
শুক্রবারের হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় এর কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম কবে পুনরায় শুরু হবে, তা জানায়নি রিয়াদ।
লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুথিদের নতুন উপস্থিতি তেল রপ্তানির এই গুরুত্বপূর্ণ পথকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। গত সপ্তাহ থেকে তেলের দাম বেড়ে মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে ওঠে।
বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই ফরাসি কূটনীতিক।
২০১৫ সাল থেকে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে চলতি মাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের লড়াই আবারও তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত বছর দুই মাস ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে এখন ওয়াশিংটন নতুন এক সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন হুমকি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সৌদি আরবকে একা ছেড়ে দেওয়া, নাকি রিয়াদকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আরেকটি ব্যয়বহুল যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
মঙ্গলবার কায়রোতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বৈঠকের পর মিসরের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এর আগে সোমবার জেদ্দায় যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদি যুবরাজ। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের মধ্যেই সীমিত রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/