দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনসহ কয়েক ডজন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শত শত ভবন ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ‘বাধা’ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেওয়া বক্তব্যের অসঙ্গতি রয়েছে। সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উন্নত ও অভিজাত অস্ত্র’ তৈরি করছে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে গোলাবারুদের ঘাটতির খবর প্রকাশের পর তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘প্রায় সীমাহীন’ গোলাবারুদ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনে আনুমানিক ২২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। একই সময়ে যুদ্ধের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়মিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব হামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপসাগরীয় দেশগুলো ও ওয়াশিংটন দাবি করেছিল, হামলাগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। তবে মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে অঞ্চলটিতে মার্কিন বাহিনী ও স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।
কতজন মার্কিন সেনা নিহত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, যুদ্ধে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য ‘যুদ্ধে নিহত’ হয়েছেন। এ ছাড়া ‘অ-শত্রুতামূলক ঘটনায়’ আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
ইরানের হামলায় ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অন্তত ছয়জন এবং একই দিনে সৌদি আরবে একজন নিহত হন। এ ছাড়া ১৭ জুলাই জর্ডানের মুয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটিতে তিনজন এবং ১৯ জুলাই ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে একজন নিহত হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১২ মার্চ ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। ১ জুলাই আরব সাগরে এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে আরও একজন নিহত হন।
এসব মৃত্যুর খবর আগেই প্রকাশ্যে এসেছিল। তবে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া বাধ্যতামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
যেসব বিমান ও হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস
মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে যুদ্ধবিমান, হামলাকারী বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আকাশপথে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন নজরদারি বিমান রয়েছে।
এফ-১৫ই: অন্তত চারটি বিমান ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটির মূল্য প্রায় ৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর গুলিতে ভূপাতিত হয়। চতুর্থটি এপ্রিলে ইরানের আকাশসীমায় যুদ্ধে ভূপাতিত হয়। সব বিমানের সদস্যদের উদ্ধার করা হয়।
এফ-৩৫এ: যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক গোপনীয়তা-সক্ষম বহুমুখী যুদ্ধবিমানগুলোর অন্তত একটি মার্চে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ-১০: স্থলবাহিনীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত অন্তত একটি ভারী সুরক্ষিত হামলাকারী বিমান ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়।
কেসি-১৩৫: অন্তত সাতটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর একটি ১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহের সময় বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন সদস্যের সবাই নিহত হন। সৌদি আরবে মাটিতে থাকা আরও পাঁচটি বিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরাকের ওই ঘটনায় জড়িত সপ্তম বিমানটিও সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে রয়েছে।
ই-৩ সেন্ট্রি: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে পরবর্তী ইরানি হামলায় মাটিতে থাকা অন্তত একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার: যুদ্ধকালীন উদ্ধার অভিযানের সময় ইরানের হামলায় অন্তত একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন: প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের অন্তত একটি উচ্চ-উচ্চতার চালকবিহীন নজরদারি বিমান এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়।
এএইচ-৬ হেলিকপ্টার: ইরানে যুদ্ধকালীন উদ্ধার অভিযানের সময় উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে চারটি ছোট হেলিকপ্টার মার্কিন বাহিনী ধ্বংস করে।
এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি: ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত একটি হামলাকারী হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়।
এমএইচ-৬০এস: ১ জুলাই আরব সাগরে অন্তত একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। চার সদস্যের মধ্যে তিনজন আহত হয়ে উদ্ধার হন, আর একজন নিখোঁজ ছিলেন।
এমকিউ-৯ রিপার: নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত দীর্ঘক্ষণ উড়তে সক্ষম চালকবিহীন এই বিমানের সর্বোচ্চ ৩০টি ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী আরও মার্কিন সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালির কাছে বেশ কয়েকবার মার্কিন নজরদারি ও হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুতে তেহরান মার্কিন সাবমেরিন ‘ডাইভ-এলডি’ আটক করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষতি
প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর শত শত ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ইরানের হামলার কারণে কয়েকটি মার্কিন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসাগরে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাতেও ক্ষতি
ইরানের হামলায় ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক ব্যয় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এ ছাড়া কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়া এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ায় প্রতি মাসে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে।
ইরাকে মার্কিন মিশন জুনের শেষ পর্যন্ত ৬০০টির বেশি হামলার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের নতুন ভবন এলাকায় একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও তুলনামূলকভাবে কম। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ কূটনৈতিক সহায়তা কেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির কারণে ৫ মার্চ কার্যক্রম স্থগিত করে। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ক্ষতি হয়।
সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ৩ মার্চ দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার ব্যয় আনুমানিক ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের একটি অবকাঠামো ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার।
/অ