দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পর্দায় কখনো খলনায়ক, কখনো নায়ক। একসময় বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় সুপারস্টার। অর্থ, খ্যাতি, জনপ্রিয়তা, সবই ছিল তার হাতের মুঠোয়। অথচ ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছে হঠাৎ করেই সব ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন আধ্যাত্মিকতার পথ। চলে গিয়েছিলেন ওশো রজনীশের আশ্রমে। সেখানে সুপারস্টার পরিচয় পাশে রেখে করেছেন বাগানের কাজ, পরিষ্কার করেছেন শৌচাগার, ধুয়েছেন থালাবাসন। তিনি বিনোদ খান্না।
‘সুপারস্টার’ থেকে ‘সন্ন্যাসী’, এরপর রাজনীতিক। জীবনের এমন নাটকীয় বাঁক খুব কম তারকার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল ৭০ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান বিনোদ খান্না। মৃত্যুর পরও তার এই ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রা বলিউডের আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে।

পেশোয়ার থেকে বোম্বে
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশোয়ারে এক পাঞ্জাবি পরিবারে জন্ম বিনোদ খান্নার। তার বাবা কিশনচাঁদ খান্না ছিলেন বস্ত্র, রং ও রাসায়নিকের ব্যবসায়ী। মা কমলা খান্না। দেশভাগের পর পরিবার চলে আসে বোম্বেতে। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে বিনোদ জানিয়েছিলেন, বোম্বেতে এসে প্রথমে বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে হয়েছিল। পরে ১৯৫৭ সালে, তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন, তখন পরিবার দিল্লিতে চলে যায়।
বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সময় ‘মুঘল-এ-আজম’ সিনেমা দেখেই চলচ্চিত্রের প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে সিডেনহাম কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক হন। এরপর শুরু হয় অভিনয়ের পথচলা।
খলনায়ক থেকে নায়ক
১৯৬৮ সালে সুনীল দত্তের ‘মন কা মিত’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় বিনোদ খান্নার। শুরুতে ‘পুরব অউর পশ্চিম’, ‘সচ্চা ঝুঠা’, ‘আন মিলো সাজনা’ ও ‘মস্তানা’র মতো সিনেমায় পার্শ্বচরিত্র বা নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
১৯৭১ সালে ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’ ও ‘এলান’-এও দেখা যায় তাকে। বিশেষ করে ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এর ডাকাত চরিত্র তাকে দর্শকের নজরে আলাদা করে তুলে আনে। তার চেহারা, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্বও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এরপর গুলজারের নজরে পড়েন বিনোদ। ‘মেরে আপনে’ (১৯৭২) ও ‘আচানক’ (১৯৭৩)-এ তাকে প্রধান চরিত্রে নেওয়া হয়। ‘আচানক’ সিনেমায় তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পায়।
এভাবেই যে অভিনেতা একসময় নায়কের বিপরীতে দাঁড়াতেন, তিনিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন নায়ক।
জনপ্রিয়তার শিখরে বিনোদ
সত্তরের দশকে এসে বিনোদ খান্না আর শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা নন, বড় তারকা। ১৯৭১ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে ৪৭টি বহু-নায়কের সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। এর মধ্যে ছিল ‘এক অউর এক গ্যারাহ’, ‘হেরা ফেরি’, ‘খুন পসিনা’, ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘জমির’, ‘পারভারিশ’ ও ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’।
অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তার জুটি তখন বিশেষভাবে আলোচিত। ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’ ও ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’-এর মতো সিনেমায় দুই তারকার উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
১৯৮০ সালের ‘কুরবানি’ও বিনোদের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমিতাভ বচ্চন চরিত্রটি ফিরিয়ে দেওয়ার পর বিনোদ খান্না সেই ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরে সিনেমাটি ওই বছরের সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রে পরিণত হয়।
কিন্তু ঠিক তখনই বদলে গেল সবকিছু।
তারকাজীবন ছেড়ে ওশোর পথে
খ্যাতির শিখরে থেকেও বিনোদ খান্নার মনে প্রশ্ন জাগত, এরপর কী? অর্থ, জনপ্রিয়তা ও চাকচিক্যময় জীবন তাকে আর আগের মতো টানছিল না। নিজের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, চলচ্চিত্রে অর্থ, চাকচিক্য ও খ্যাতি পাওয়ার পরও তার মনে প্রশ্ন জাগত, ‘এখন কী?’
ওশো রজনীশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমদিকে প্রতি সপ্তাহান্তে পুনের ওশো আশ্রমে যেতেন তিনি। এমনকি শুটিংয়ের সময়সূচিও বদলে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর তিনি ওশোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর আসে সেই সিদ্ধান্ত, যা বদলে দেয় তার জীবন।
১৯৮২ সালে ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় চলচ্চিত্র ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে ওশোর গড়া রাজনিশপুরমে চলে যান বিনোদ খান্না।
সেখানে কোনো তারকার মতো জীবন কাটাননি তিনি। বরং আশ্রমে মালি হিসেবে কাজ করেছেন। নিজের ভাষায়, ওশোর বাগানের পরিচর্যা করেছেন, শৌচাগার পরিষ্কার করেছেন, থালাবাসন ধুয়েছেন। এমনকি পোশাক পরখ করার কাজেও তাকে ব্যবহার করা হতো, কারণ শারীরিক গড়নে তিনি ওশোর কাছাকাছি ছিলেন।
আশ্রমে তার নাম দেওয়া হয় ‘স্বামী বিনোদ ভারতী’।
চার বছর পর ফিরে এলেন
ওশোর সঙ্গে রাজনিশপুরমে চার বছর কাটান বিনোদ খান্না। পরে আবার বলিউডে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, সিনেমায় ফিরে আসাটা সহজ ছিল; কঠিন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নিজের গুরু ওশোকে ছেড়ে আসা।
ওশো তাকে পুনের আশ্রম পরিচালনার দায়িত্বও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিনোদ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। পরে তিনি বলেছিলেন, জীবনে বলা সবচেয়ে কঠিন ‘না’ ছিল সেটিই।
ব্যক্তিজীবনেও পড়েছিল প্রভাব
আধ্যাত্মিকতার পথে যাত্রার প্রভাব পড়েছিল তার ব্যক্তিজীবনেও। ১৯৭১ সালে গীতাঞ্জলি খান্নাকে বিয়ে করেছিলেন বিনোদ। তাদের দুই সন্তান রাহুল ও অক্ষয় খান্না। দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকার কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৯০ সালে কবিতা দফতরিকে বিয়ে করেন বিনোদ খান্না। তাঁদের দুই সন্তান সাক্ষী ও শ্রদ্ধা।
পর্দা থেকে সংসদে
বলিউডে ফিরে এসে আবারও নিজের জায়গা তৈরি করেন বিনোদ খান্না। তবে তার জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় তখনও বাকি ছিল। ১৯৯৭ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন তিনি। এরপর রাজনীতিতেও নিজের অবস্থান তৈরি করেন। পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর লোকসভা আসন থেকে চারবার নির্বাচিত হন তিনি।
পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন বিনোদ খান্না।
এক জীবনে এতগুলো পরিচয় ধারণ করেছিলেন তিনি। খলনায়ক থেকে নায়ক, নায়ক থেকে সুপারস্টার, তারপর সন্ন্যাসী এবং শেষ পর্যন্ত রাজনীতিক। তাই বিনোদ খান্নার গল্প শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকার গল্প নয়, বরং নিজের জীবনের পথ বারবার বদলে নেওয়া এক মানুষের অসাধারণ যাত্রার গল্প।
/অ