দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

এক মাসের ব্যবধানে নওগাঁর বাজারে সুগন্ধি চিনিগুড়া চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যে চাল গত মাসেও ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২৩০ টাকায়। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চিনিগুড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকায়। চালের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
বাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মূল্য নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করলেও সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রপ্তানির অনুমতি পাওয়ার পর এরও প্রভাব বাজারে পড়তে পারে। তবে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের দাবি, করপোরেট ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণই দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সরেজমিনে নওগাঁ পৌর খুচরা ও পাইকারি চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে আতপ চিনিগুড়া চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। মাসের হিসাবে এই বৃদ্ধি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। বর্তমানে খোলা বাজারে মানভেদে চিনিগুড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২১০ টাকায়। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চালের দাম ২০০ থেকে ২৩০ টাকা।
একই সময়ে কাটারি ও জিরাশাইলসহ চিকন চালের দামও বেড়েছে। বর্তমানে এসব চাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকা কেজি দরে। যদিও মোটা স্বর্ণা-৫ চালের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
চকবাড়িয়া এলাকার শ্রমজীবী আব্দুর রহিম বলেন, “আগে মাসে দুই-তিন কেজি চিনিগুড়া চাল কিনতাম। এখন এক কেজি কিনতেই হিসাব করতে হয়। বাচ্চাদের জন্য বা অতিথি এলে পোলাও রান্না করাও কঠিন হয়ে গেছে।”
শহরের বরেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, “চালের এমন দাম বাড়বে ভাবিনি। বাজারে গেলে প্রতিদিনই নতুন দাম শুনতে হচ্ছে। সরকারি নজরদারি না বাড়ালে সাধারণ মানুষের পক্ষে এই চাল কেনা সম্ভব হবে না।”
বাজারে কথা হয় আরও কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা পাচ্ছেন না। কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে অসাধু চক্র সুযোগ নিচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
নওগাঁ পৌর খুচরা ও পাইকারি চাল বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ৫০ কেজির একেকটি চিনিগুড়া চালের বস্তার দাম এক মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সুবল চন্দ্র সেন বলেন, “করপোরেট কোম্পানিগুলো প্যাকেটজাত চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় খোলা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, “চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, “চিনিগুড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। এর উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা অনেক বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।”
নওগাঁর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেন, “সুগন্ধি জাতের চাল সাধারণত বছরে একবার উৎপাদিত হয়। অতীতে এই চাল বিদেশে রপ্তানির অনুমতি ছিল না। সম্প্রতি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বাজারে এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ আপাতত আমার জানা নেই।”
নওগাঁ জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রুবেল আহমেদ বলেন, “সুগন্ধি চালের এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য মূলত দেশের করপোরেট ব্যবসায়ীরাই দায়ী। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছে। আমরা খুব শিগগিরই এ বিষয়ে বাজারে অভিযান পরিচালনা করব। এর সঙ্গে নওগাঁর কোনো স্থানীয় ব্যবসায়ী জড়িত আছেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।”
বিশেষজ্ঞ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সুগন্ধি চালের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন, মজুত, সরবরাহ, রপ্তানি ও মূল্য নির্ধারণ—সব পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সিন্ডিকেটের কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে সুগন্ধি চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে সাধারণ ভোক্তা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যপণ্য আবারও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে।
কেএম