দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুবসমাজের স্বপ্ন ছিল আধুনিক প্রযুক্তিকেন্দ্র। লক্ষ্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণ তৈরি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ আট বছরের দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগে মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন মাগুরার আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
মাগুরা শহরের স্টেডিয়াম পাড়ায় প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন ছয়তলা গোলাকৃতির দৃষ্টিনন্দন ভবনটি বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয়, ভেতরের বাস্তবতা ততটাই হতাশাজনক। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আগাছা-জঙ্গল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলাতেও সেখানে শেয়াল, সাপ ও বেজির আনাগোনা দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্তপ্রায় অবস্থার কারণে ক্ষুব্ধ স্থানীয়দের কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে প্রকল্পটির নাম দিয়েছেন-ফক্স পার্ক’।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে দেশের আটটি জেলার সঙ্গে মাগুরাতেও ‘আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘লিটন ট্রেডার্স’ নির্মাণকাজ শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা যেন কাগজেই আটকে গেছে।
এক দফা নয়, দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নেওয়া হলেও সেই সময়সীমাও পার হয়ে গেছে। অথচ প্রকল্পের কাজ এখনো মাত্র ৬৪ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থাৎ যে প্রকল্প দেড় বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেটি প্রায় আট বছরেও শেষ হয়নি। প্রশ্ন উঠছে-এই দীর্ঘ আট বছরে গেল কোথায় সরকারি অর্থ, গেল কোথায় তদারকি, আর দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতাই বা কোথায়?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, একই প্রকল্পের আওতায় দেশের অন্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সাতটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অন্য জেলার তরুণরা যখন প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তখন মাগুরার তরুণদের কপালে জুটেছে শুধু নির্মাণাধীন ভবন আর বছরের পর বছর অপেক্ষা। প্রকল্পের অর্থব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, এখানে হরিলুট করা হয়েছে। ঠিকাদারসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এমন অভিযোগ ওঠার পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে, তাহলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হওয়াই স্বাভাবিক। অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন,আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার করা উচিত।
স্টেডিয়াম পাড়ার বাসিন্দা মো. আল আমিন বলেন, ২০১৮ সাল থেকে এই কাজ চলমান। সরকার পরিবর্তনের পর এই কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের বিনীত আবেদন, দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করা হোক।
আরেক বাসিন্দা মো. আব্দুল আলিম বলেন, আইটি পার্কটি অনেকদিন ধরে এভাবে পড়ে আছে। দ্রুত বাস্তবায়ন করে এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হোক।

স্থানীয় আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের কাজগুলো কখনো সঠিকভাবে হয় না। ২০১৮ সালে শুরু হয়েছে, এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যারা দায়িত্ব নিয়েছে, মনে হয় তারা হরিলুট করেছে। না হলে এতদিনেও কাজ কেন হবে না? শুনেছি, কাজ করার আগেই ঠিকাদার ৮০ শতাংশ বিল তুলে নিয়ে গেছে। তবে তার এ অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুধু ভবন নির্মাণই নয়, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অবস্থাও তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন। আইটি পার্কে কর্মরত এক কর্মচারী বলেন, আমি আইটি পার্কে কাজ করি। আমি লিপ কোম্পানি থেকে এসেছি। গত তিন বছর ধরে কাজ করছি। দ্রুত কাজ শেষ হলে আমরা এখান থেকে চলে যেতে পারি।
আরেক কর্মী রাকিব হাওলাদার বলেন, শুরু থেকেই কাজের অগ্রগতি খুব ভালো ছিল। এখন কাজের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরাও ১৪ মাসের বেতন পাব। যদি খুব শিগগির কাজ শেষ হয়, তাহলে আমরাও বাঁচি।
অর্থাৎ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার খেসারত শুধু সরকারি অর্থই দিচ্ছে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমিক-কর্মচারীরাও ভুগছেন অনিশ্চয়তায়।
এদিকে মাগুরার জেলা প্রশাসক মো. মোতাকাব্বির আহমেদ বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে জানেন যে, এই ভবনটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইটি পার্ক করা হচ্ছে। এটাকে দ্রুত শেষ করে কর্মসংস্থান করা হবে।
কিন্তু এখানেই মাগুরাবাসীর প্রশ্ন-দ্রুত’ বলতে আর কত বছর?
যে প্রকল্প ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি ২০২৬ সালেও শেষ হয়নি। একের পর এক মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। এখন আবার নতুন আশ্বাস। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-আশ্বাসের পর আশ্বাস, বাস্তবায়ন কবে?
প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিল পরিশোধে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না-তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজের মান যাচাই, এ পর্যন্ত কত টাকা ছাড় হয়েছে, কত টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে, কাজের বিপরীতে বিলের সামঞ্জস্য কতটুকু এবং প্রকল্প বিলম্বের জন্য কারা দায়ী-এসব বিষয় প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন।
কারণ এটি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব অর্থের প্রকল্প নয়। এটি জনগণের করের টাকায় নির্মিত সরকারি প্রকল্প। সেখানে বছরের পর বছর কাজ পড়ে থাকবে, সময়সীমা বারবার বাড়বে, আর জনগণ শুধু আশ্বাস শুনবে-এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার চিত্র হতে পারে না।
মাগুরার তরুণদের জন্য যে স্থাপনা হওয়ার কথা ছিল প্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র, সেটিই এখন দীর্ঘসূত্রতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
স্বপ্ন ছিল আইটি পার্কের-বাস্তবে মিলেছে আট বছরের অপেক্ষা। প্রতিশ্রুতি ছিল কর্মসংস্থানের-মিলেছে জঙ্গল আর পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণ। বরাদ্দ ছিল কোটি কোটি টাকা-কিন্তু প্রশ্ন উঠছে কাজের অগ্রগতি ও অর্থব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে। স্থানীয়দের দেওয়া ‘ফক্স পার্ক’ নামটি তাই এখন শুধু ব্যঙ্গ নয়; এটি দীর্ঘ আট বছরের হতাশা, ক্ষোভ এবং জবাবদিহির দাবির প্রতিচ্ছবি।
মাগুরাবাসীর একটাই প্রশ্ন-৭০ কোটি টাকার এই প্রকল্প আর কত বছর নির্মাণাধীন থাকবে? আর কত প্রজন্মের তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে?
কেএম