দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও অনিশ্চিত কৃষির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য গবাদিপশু পালন এখন অন্যতম নির্ভরযোগ্য জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। কৃষিতে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়লেও গরু-ছাগল পালন করে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং দারিদ্র্য কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত এক দশকে বন্যা ও নদীভাঙনের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীভাঙনের তীব্রতায় বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি সদর উপজেলার ঝুনকার চরে খামারি ওসমান গনীর সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান।
ওসমান গনী বলেন, ‘গরু পালন লাভজনক হওয়ায় প্রয়োজনে ঋণ নিলেও গরু বিক্রি করে তা সহজেই পরিশোধ করা যায়। এমনকি গবাদিপশু দেখিয়েও এনজিও থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব।’
তিনি জানান, একটি গরুর বাছুর এক বছর পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়, যা তার মতো পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা।
জেলার বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) তথ্য অনুযায়ী, পশুপালনের জন্য বীমা সুবিধা রয়েছে। এছাড়া ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয় এবং বীমাকৃত পশুর ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার গরু, ১১ হাজার মহিষ, ৭ লাখ ৪৫ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৪৯ হাজার ভেড়া এবং ৩ হাজার ২১৬টি ঘোড়া রয়েছে। এসব গবাদিপশুর বড় অংশই চরাঞ্চলে লালন-পালন করা হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ গবাদিপশু চরাঞ্চলে পালন করা হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় খোলা মাঠে চরিয়ে এসব পশু লালন-পালন করেন খামারিরা।
তিনি বলেন, বন্যার সময় গবাদিপশুকে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে রাখতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত শুকনো খাদ্য সংরক্ষণ করতে হবে। বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ঘাস বা দূষিত খাবার এবং ময়লা পানি গবাদিপশুকে খাওয়ানো উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, বর্ষা ও বন্যার সময়ে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্ন খাদ্য এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জুন ও জুলাই মাসে বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকায় আগাম সতর্কবার্তা পেলে গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। খরার মৌসুমের জন্য খড় ও ঘাসও সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রহিম উদ্দিন হায়দার রিপন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও এবং ভয়স কলের মাধ্যমে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা পান। সাধারণত তারা পাঁচ থেকে ১০ দিন আগেই বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন।
জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার ও জিঞ্জিরামসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় সাড়ে চারশ চর রয়েছে। এসব চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস।
পোড়ার চরের বাসিন্দা জহুরুল হক বলেন, কৃষিকাজে তেমন লাভ না হওয়ায় তিনি বর্গায় গরু এনে পালন করেন। বর্তমানে তার চারটি গরু রয়েছে এবং বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। গবাদিপশু অসুস্থ হলে নৌকায় করে হাটে নিয়ে যান অথবা প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসকের সহায়তা নেন।
সাহেবের আলগা চরের বাসিন্দা কালু মিয়া বলেন, ‘চরের মানুষের সবসময় দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কৃষির পাশাপাশি গরু পালন না করলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যেত।’
পোড়ার চরের নুর জাহান বেগম বলেন, তার স্বামী ঢাকায় কাজ করলেও তিনি বাড়িতে গরু পালন করেন। চরাঞ্চলে প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় খাদ্য ব্যয় কম হয় এবং গরু বিক্রি করে বছরে ভালো আয় করা সম্ভব। তিনি জানান, নারী খামারিরাও ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে আবহাওয়ার সতর্কতা পান এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ গ্রহণ করেন।
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর বলেন, ইউনিয়নের ২৫টি চরে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের বসবাস। পুরুষদের অনেকেই কর্মসূত্রে বাইরে থাকায় বাড়িতে থাকা নারীরাই গবাদিপশু পালন করে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। বর্তমানে গবাদিপশু পালন চরবাসীর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর ঘাস জন্মায়। ফলে গরু-ছাগল পালনে খাদ্য ব্যয় কম হয় এবং খামারিরা লাভবান হন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদান ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি চরাঞ্চলের মানুষকে গবাদিপশু পালন আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
এমএম