দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার একসময়ের সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. হানিফ শেখ (৪০) এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিবারের দাবি, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অথচ এখনও তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে দায়ের হওয়া একটি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে।
হানিফ শেখ নাজিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কলাতলা গ্রামের মৃত সিদ্দিক শেখের ছেলে। তিনি কলাতলা ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে তার ওপর চালানো হয় নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ফলেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
ভুক্তভোগী হানিফ শেখের ছোট ভাই ও উপজেলা কৃষক দলের নেতা মো. আনিস শেখ জানান, ২০১৪ সালের ৬ অক্টোবর সকালে তার বড় ভাই ব্যবসার কাজে খুলনায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। পথে উপজেলার শেখমাটিয়া ইউনিয়নের বুইচাকাঠী এলাকার কুদিরবাড়ি বাজার সংলগ্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী তাকে আটক করে বেদম মারধর করে। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন খানের নির্দেশে তাকে দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশ সদস্যদের সামনেই তাকে বেঁধে রেখে নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনিস শেখ আরও বলেন, ‘নির্যাতনের এক পর্যায়ে আমার ভাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাকে মিথ্যা মামলায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তিনি ছয় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন তাকে বাড়িতে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়েছিল। সম্প্রতি চিকিৎসকের পরামর্শে শিকল খুলে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, একই দিন রাতে তাদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। পরদিন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ছয়টি বসতঘরে আগুন দেওয়া হয় এবং লুটপাট চালানো হয়। একের পর এক মামলা, হামলা ও অগ্নিসংযোগে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। হানিফ শেখের নামে পাঁচটি এবং তার নিজের নামে আটটি ‘মিথ্যা ও গায়েবি মামলা’ দায়ের করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আনিস শেখ বলেন, ‘২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আমরা থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মামলা নেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে নাজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, হানিফ শেখের ওপর হামলার ঘটনায় কেউ থানায় মামলা করতে আসেনি। কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে হানিফ শেখের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হাসান খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়ে হানিফ শেখ মানসিক ভারসাম্য হারান। আমরা তার পাশে আছি। উন্নত চিকিৎসার জন্য দলীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. মিজানুর রহমান দুলাল বলেন, ‘২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর কলাতলা গ্রামে পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগের দিন হানিফ শেখকে ধরে নির্যাতন করা হয়। সেই ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন।’
এদিকে হানিফের ওপর নির্যাতনের বিষয়টিকে সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক হাফিজ আল আসাদ সাঈদ খান। তিনি বলেন, ‘ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যে নির্যাতন হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত। এছাড়াও হানিফের ঘাড়ের ওপর যে মামলাগুলো চলমান রয়েছে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ ও তাকে পুনর্বাসন করা সরকারের দায়িত্ব। বিএনপি তার দলের নির্যাতিত ও নিপীড়িত কর্মীর জন্য কী করবে, সেটা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। ইতিমধ্যেই দলের পক্ষ থেকে নানাভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে।’
জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকারের সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে। হানিফ শেখ তার একটি নির্মম উদাহরণ। আমরা তার চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় কাজ করছি। ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও করা হবে।’
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘হানিফের উন্নত চিকিৎসা খুব জরুরি। আমরা চাই তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে। এজন্য আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে সহযোগিতা করছি। ভবিষ্যতেও তাকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
কেএম