দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এক নিসর্গময় জনপদ ‘সীমান্তবর্তী গারোপাহাড়’। আকাঁবাকাঁ জনপদ, পাহাড়ি টিলা, ঝিরিঝিরি ঝর্ণাধারা আর সবুজ বনভূমির মাঝে প্রতিদিনই গেজে ওঠে নতুন নতুন স্বপ্ন। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে আরেক কঠিন বাস্তবতা—পিছিয়ে পড়া কিছু শিশুর অপূর্ণ শিক্ষাজীবন। সেই অন্ধকার ভেদ করতেই, সীমিত সামর্থ্য আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এখন এলাকায় জাগাচ্ছে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আলো।
২০১৮ সালে থেকে নালিতাবাড়ি উপজেলার বারোমারী মিশনের বিপরীতে, দোকান ভাড়ার ছোট একটি কক্ষে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বসে এক ব্যতিক্রমী পাঠশালা। বিদ্যালয়ের কোনো নাম নেই, নেই সাইনবোর্ড। তবু এখানে জড়ো হয় ২০-৩০ জন শিশু; কারও হাতে ছেঁড়া বই, কারও খাতা পুরোনো, কারও পায়ে জুতা নেই। কিন্তু সবার চোখে একটাই স্বপ্ন-শেখা। এই পাঠশালার উদ্যোক্তা দম্পতি শিক্ষক প্রদীপ ম্রং (৬৬) ও লিপি নেংমিঞ্জা (৫৮)। দুজনেই ক্যাথলিক মিশন ভিত্তিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। নিয়মিত দায়িত্ব শেষ করে বিকেলের অবসর সময়টুকু তারা উৎসর্গ করেছেন এই শিশুদের জন্য।
এ বিষয়ে শিক্ষক প্রদীপ ম্রং জানান, দীর্ঘ ৮ বছর আগে মাত্র পাঁচজন শিশুকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে আগ্রহ, বাড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে প্রতিদিন ২৫ জনের বেশি শিশু এখানে নিয়মিত পড়তে আসে। এখানে অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে স্কুলে যেতে পারে না। কেউ কাজ করে, কেউ পরিবারের দায়িত্ব নেয়। আমরা চাই অন্তত মৌলিক শিক্ষাটা যেন ওরা পায়। ছোট্ট কক্ষটি ভাড়া নিতে হয়েছে নিজ উদ্যোগেই। ১০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে মাসে ৬০০ টাকায় নেওয়া এই ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। দিনের আলোই ভরসা। মাটিতে পাটি পেতে বসে চলে পাঠদান। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দিনমজুর বা নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। অনেকেই এখনো আনুষ্ঠানিক স্কুলে যায়নি। এই পাঠশালাই তাদের প্রথম শেখার জায়গা।
পাঠদানের পদ্ধতিতেও আছে ভিন্নতা। বইয়ের পাশাপাশি গান, কবিতা, গল্প আর খেলাধুলার মাধ্যমে শেখানো হয়। যাতে শেখা হয় আনন্দের, চাপের নয়। স্থানীয়ভাবে এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। শুরুতে কেউ গুরুত্ব না দিলেও এখন অনেক অভিভাবকই সন্তানদের পাঠশালায় পাঠাতে আগ্রহী।
স্কুল শিক্ষক ও অভিভাবক গীতি হাগিদক বলেন, আমি নিজেই একজন শিক্ষক, নিজের বাচ্চার যথেষ্ট দেখভাল করা হয়ে উঠে না। একদিন এই পাঠশালায় আসতে চায় এবং নিয়ে আসি। কারণ সে মজা করে পড়াতে পারছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক কাঞ্চন মিস্টার মারাক বলেন, বিদ্যালয়টি পরিচালনায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। জায়গার সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, উপকরণের অভাব; সবকিছু নিয়েই চলছে লড়াই। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ড, যেখানে বোর্ডে লিখে দিলে সব শিশুদের বুঝতে সহজ হয়। দিন শেষে যখন সূর্য ডুবে যায় গারোপাহাড়ের আড়ালে, তখন এই ছোট্ট কক্ষটিতে জ্বলে ওঠে অন্যরকম এক আলো; শিক্ষার আলো, আশার আলো।
মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিও সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান আনোয়ার-ই-তাসলিমা বলেন, গারোপাহাড়ে একসময় আমাদের স্কুল ছিলো। আর সেখানে প্রদীপ ম্রং ও লিপি নেংমিঞ্জা যে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছে, সেটি অত্যন্ত চমৎকার উদ্যোগ।
গারো শিক্ষক দম্পতি আরও জানান, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা বিভিন্ন সংগঠন যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, তবে আরও অনেক শিশুকে সময় ও সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। তাদের সহযোগিতা শিশুদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, পরিবেশগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে—যা তাদের সঠিকভাবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।
কেএম/কে