দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

৭ মাস আগেই প্রবাসে মারা যায় বাবা। একটু একটু করে যখন পরিবার আর সন্তানরা সেই শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলো ঠিক তখনি আরেকটি ঝড় এসে পুরো তছনছ করে দেয় গোটা পরিবারকে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মুহূর্তেই ঝরে পড়ে পরিবারের সবচেয়ে ক্ষুদে ফুল আব্দুল্লাহ ছামীম (১৪)। এমন ঘটনায় নির্বাক, নিস্তব্ধ গোটা পরিবার। আর ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি স্বজনদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএমখালি মাঝিকান্দি এলাকার আবুল কালাম মাঝি ও জুলেখা বেগম দম্পত্তির ছেলে আব্দুল্লাহ ছামীম (১৪)। থাকতেন ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি খালপাড় এলাকায়। ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট ছামীম। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী ছিল সে। স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। আগে মাদরাসায় পড়াশোনা করলেও পরবর্তীতে তাকে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়।

গত ডিসেম্বর মাসে প্রবাসে মারা যায় বাবা আবুল কালাম মাঝি। এরপর থেকে মা, বোন ও বড় ভাইয়ের আদর যত্নে বেড়ে উঠছিলেন ছামীম। প্রতিদিনের ন্যায় সহপাঠীদের সঙ্গে সোমবার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করছিলেন ছামীম। টিফিনের আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি, এরই মধ্যে বিকট শব্দে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয় বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। সেই ঘটনায় অন্যান্যদের সঙ্গে গুরুতর আহত হয় ছামীম। পরবর্তীতে তাকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করে স্বজনদের খবর দিলে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ার তাকে ভর্তি করা হয় বার্ন ইউনিটে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে ১১টার দিকে মৃত্যুবরণ করেন ছামীম।
এদিকে ছামীমের মৃত্যুর খবর তার গ্রামে পৌঁছালে এলাকা জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি ডিএমখালি মাঝিকান্দি এলাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে সকাল ৯ টায় চরভয়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। ছামীমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
আহাজারি করতে করতে ছামীমের মা জুলেখা বেগম বলেন, ‘আমার বাবা বলেছিলো হাসপাতাল এতো দূরে কেন। কাছাকাছি হাসপাতাল হতে পারে না। আমাকে তোমরা চিকিৎসা করাতে বিদেশে নিয়ে যাও। আমার বাবা বাঁচতে চাইছিলো। কেন আমার বাবা এভাবে চলে গেলো।’
আব্দুল্লাহ ছামীমের মামাতো ভাই বারেক হোসাইন বলেন, ‘ও আমাদের খুবই আদরের ছিল। নম্র-ভদ্র এবং মেধাবী হওয়ার কারণে আমরা তাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। আমার ফুফা ৭ মাস আগে সৌদি আরবে বসে মারা যায়। আর সেই শোক কাটাতে না কাটাতে আমাদের আদরের ছামীমও চলে গেলো। সবাই ছামীমের জন্য দোয়া রাখবেন, যাতে আল্লাহপাক ওকে জান্নাত দান করেন।’
ছামীমের সঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন তার মামাতো ভাই আব্দুল্লা হুসাইন। গ্রামে আসলে তারা দুজন সময় কাটতো একসঙ্গে। এমনকি ঢাকায় গেলে আব্দুল্লাকেও বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতেন ছামীম। ছোটবেলার খেলার সাথীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আব্দুল্লা বলেন, ‘একসঙ্গে বড় হয়েছি। আমি ঢাকায় কিছুই চিনতাম না, ও আমাকে ঢাকা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। আজ ছামীম আমাকে একা রেখে চলে গেলো, আমি কীভাবে থাকবো।’
ভাগনেকে ভীষণ ভালোবাসতেন মামা সাইফুল ইসলামও। ছোট ভাগনের এমন করুণ মৃত্যু যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে ভীষণ মেধাবী ছিল আমার ভাগনে। ওর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। বাবার মৃত্যুর পর ওকে সবাই আগলে রেখেছিলাম।’
এসময় তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বিমান প্রশিক্ষণের জন্য খোলা ময়দান রয়েছে। কিন্তু ব্যস্ততম এলাকায় যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল, সেই জায়গায় কীভাবে বিমান প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া হলো। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
এ ব্যাপারে ভেদরগঞ্জ সহকারী কমিশনার ভূমি ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মোহাম্মদ মোজাহেরুল হক বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছি। আমরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা সব সময় থাকবো।’
/অ