দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সম্পর্কের সুত্র ধরে লেনদেন হয় মেয়ের বাবা ও শ্বশুরের মধ্যে। কিন্তু নিকট আত্মীয় হলেও মাত্র ৫ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে শ্বশুর মঞ্জুর হাসান মাসুদের হাতে দিতে হলো একটি সাদা চেক। সম্পর্কের টানা পোড়েনে সেই সাদা চেকটায় আজ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির পরিবারের। পরিবারের অভিযোগ বিশেষ প্রয়োজনে ৪ লক্ষ ৮৮হাজার টাকা তার মেয়ের শ্বশুরের থেকে নিলেও সে সময় তাকে দিয়েছিলেন সই করা একটি সাদা চেক। পরবর্তীতে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধও করা হয়েছে সেই টাকা! তারপরও সই করা সাদা চেকে ৫০ লক্ষ টাকার বিশাল অংক বসিয়ে করেছেন মামলা! এমনটিই দাবি ভুক্তভুগী পরিবারটির।
এছাড়াও যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহের মঞ্জুর হাসান মাসুদের পুত্র মো. অর্নব ইবনে হাসানের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই তিনি আরেকটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সময় রেখে দেওয়া হয় তার গহনা, স্কুল পাসের সুল সার্টিফিকেট, পাসপোর্টসহ ব্যবহারিক জিনিসপত্র! এমনকি ২য় বিয়ে করার সময় স্ত্রীর গলায় যে স্বর্ণের হার পরিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটাও প্রথম স্ত্রীর বলে দাবি করেন প্রথম স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে!
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট ঝিনাইদহের আরাপপুরের বাসিন্দা মো. মঞ্জুর হাসান মাসুদের ছেলে মো. অর্নব ইবনে হাসানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ওই নারীর। ঐ নারী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের জিবনা গ্রামের মহিউদ্দীন বকুলের কন্যা।
মোটর গাড়ীর ব্যবসার সুবাদে স্ত্রী ও পরিবারসহ ঢাকাতে বসবাস করতেন অর্নব ইবনে হাসান। বিবাহের কয়েকদিন পরে স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে ভারতেও যান। বিবাহের দুই মাস পরেই বাচ্চা পেটে আসে ভুক্তভোগী ঐ নারীর, তারপর থেকেই যৌতুকের টাকার দাবি করে আসছিলেন অর্নব ইবনে হাসান ও তার বাবা মঞ্জুর হাসান মাসুদ। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন ঐ নারী। পরিবারটি আরও অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী নারীর ভাই আমেরিকা প্রবাসী বিভিন্ন সময় তার বোন ও বোন জামাইকে নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিয়েছেন এবং হানিমুনে যাবতিয় খরচও তার ভাই আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছিলেন! ঐ নারী বর্তমানে তিন বছরের একটি কন্য সন্তানসহ বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন।
ঐ নারী জানান, আমাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল, বিয়ের পরে আমরা একমাস ভালো ছিলাম, আমার হানিমুনেও গেছিলাম ভারতে। সেখান থেকে ফিরে আসার পরে আমার স্বামী ও শশুরের আচরণ পাল্টে যেতে থাকে, তারা সবসময় আমাকে নানানভাবে হেনস্তা ও নির্যাতন করতো টাকার জন্য। আমার পরিবারের সাধ্য অনুযায়ী বেশ কয়েকবার স্বামী ও শশুরকে টাকাও দিয়েছে আমার পরিবার। পরবর্তীতে আমার স্বামী হাসান ও শ্বশুর মঞ্জুর হাসান মাসুদের চাহিদা বাড়তে থাকে, একসময়ে আমার পরিবার টাকা দিতে না পারায় আমার উপর অমানসিক নির্যাতন শুরু করে আমার শ্বশুর, শাশুড়ী ও তার ছেলে। আমাকে কয়েকবার তারা হত্যারও চেষ্টা করেছে। আমাকে হত্যার জন্য আমার গলায় লাইলনের দড়ি পেচিয়ে বাথরুমের হ্যাঙ্গারের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, সেখান থেকে আমাকে পাশের বাসার লোকজন ও বাসার গাড়ী চালক উদ্ধার করে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ভর্তি করেন। এই ঘটনার পরে তারা আমার বাবকে ঢাকাতে খবর দিয়ে নিয়ে যায়, সেখানে আমার বাবাকে ও আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করে একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নিয়ে আমার বিয়ের জিনিসপত্র, স্বর্ণালংকার রেখে দিয়ে আমাকে তাদের বাসা থেকে বের করে দেয়। তারপর থেকে তারা আমার আর কোনো খোঁজ খবর রাখে নাই। আমার পরিবার থেকে অনেক চেষ্টা করেছে আমাদের সংসারটি ঠিক করার জন্য কিন্তু তাদের পরিবার থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তারপরে আমার একটি কন্যা সন্তান হয়েছে, তাকেও তারা কোনোদিন দেখতে আসেনি।
পরবর্তীতে জানতে পারি আমার স্বামী অর্নব হাসান আমাকে তালাক দিয়েছে, এবং আমাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করে নেওয়া একটি সাদা স্ট্যাম্প ও অন্য স্ট্যাম্প ভেন্ডর থেকে ক্রয়কৃত দুটি আলাদা স্ট্যাম্পে আমার স্বাক্ষর জাল করে আমার স্বামীর সঙ্গে সংসার না করার অঙ্গিকারনামা তৈরি করেন। পরবর্তীতে আমরা চুয়াডাঙ্গা কোর্টে একটি স্ট্যাম্প জালিয়াতির মামলা করি, সেই মামলা এখন বিচারধীন আছে। কোর্ট আমার স্বাক্ষর ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে, সেখানে স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
এ বিষয়ে ওই নারীর বাবা মহিউদ্দীন বকুল বলেন, আমার মেয়েকে ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট পারিবারিক বিয়ে দিয়েছিলাম, বিয়ে দেওয়ার সময় আমাদের পক্ষ থেকে কোনো কিছু দেওয়ার কথা না থাকলেও আমরা আমাদের সাধ্যমত জিনিসপত্র দিয়েছিলাম তাদেরকে, যাতে বিয়ের পরে আমার মেয়ে সেখানে ভালো থাকে। মেয়ের বিয়ের সময় আমি অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে মেয়ের বিয়ের ঘটক মো. সেলিম মঞ্জুর হাসান মাসুদের কাছ থেকে আমাকে ৪ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা নিয়ে দেয়, টাকার পরিবর্তে আমি তাদেরকে সরল বিশ্বাসে একটি সাদা চেক দেই। পরবর্তীতে তাদেরকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এর মাধ্যমে আরও ১২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে মোট ৫ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছি। যার সমস্ত প্রমাণাদি আমাদের কাছে আছে।
কিন্তু বিয়ের এক মাস পর থেকেই তাদের সুর বদলাতে থাকে, তারা আমাদের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ দিতে থাকে টাকার জন্য, এবং আমার মেয়েকে নানা ভাবে অত্যাচার নির্যাতন করতে থাকে। পরে যৌতুকের টাকা দিতে না পারায়, তারা আমাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে আমার মেয়েকে এক কাপড়ে আমার সাথে গ্রামে পাঠিয়ে দেই।
তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তারা আমার মেয়ের কোনো খোঁজ খবর রাখেনি। এ বিষয়ে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে যেয়ে দেখি আমার দেওয়া চেকে তারা ৫০ লক্ষ টাকা লিখে আমার বিরুদ্ধে উল্টো কোর্টে মামলা দিয়েছেন। এবং আমি তাদের কাছ থেকে ব্যবসার কাজের জন্য ৭৮ লক্ষ টাকা নিয়েছি এমন একটি স্ট্যাম্পে আমার স্বাক্ষর জাল করে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারনামা তৈরি করেছে। সেখানে তারা উল্লেখ করেছে আমি ৭৮ লক্ষ টাকার মধ্যে ২৮ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছি, বাকী ৫০ লক্ষ টাকাও পরিশোধ করব। অথচ তাদেরকে আমি কোনো টাকা দেইনি, তারা যে আমার কাছ থেকে ২৮ লক্ষ টাকা নিয়েছেন তার কোনো ডকুমেন্টস তাদের কাছে নেই, বা আমি তাদেরকে কিভাবে ২৮ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছি তা আমি নিজেই জানি না। তারা তাদের অপকর্মের শাস্তির ভয়ে আমাদের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা ও বানোয়াটি কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছে।
এসকল অভিযোগের বিষয়ে মঞ্জুর হাসান মাসুদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মহিউদ্দিন বকুলের মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম। পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বিয়ের সময়ে মহিউদ্দিন বকুল আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ৭৮ লক্ষ টাকা ধার নেন। ৭৮ লক্ষ টাকার মধ্যে নগদ ৫ লক্ষ দিয়েছেন, একটি গাড়ি বাবদ ২৩ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। বাকি ৫০ লক্ষ টাকার জন্য আমাকে একটি চেক দিয়েছিলেন, তার ব্যাংক একাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়। বর্তমানে এ বিষয়টি নিয়ে কোর্টে মামলা চলমান রয়েছে। ষ্ট্যাম্প জালিয়াতির মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এবিষয়টি সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করে জানান স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত হয় নাই। এবিষয়ে আমরা আদালতে বলেছি, এই স্বাক্ষরটি পুণরায় ফরেনসিকের জন্য।
তবে মঞ্জুর হাসান মাসুদ তার ছেলের শশুর সম্পর্কে বিয়াই বকুলকে এত বিশাল অংকের টাকা কবে কিভাবে দিয়েছিলেন জানতে চাইলে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি!
এফএইচ