দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

টাঙ্গাইল পৌরভবনের সামনে তিন বছরেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ হয়নি। এ নিয়ে নানা মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর ভাস্কর্য শিল্পীর পরিবর্তে প্রতিমা তৈরির কারিগর দিয়ে ভাস্কর্য করায় তা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে প্রভাব খাটিয়ে রাতের আঁধারে ভেঙে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা হয়েছে।
পৌরসভা সুত্রে জানা যায়, শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম সিরাজুল হক আলমগীর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পৌরভবনের সামনে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০২১ সালের ২৭ জুলাই টাঙ্গাইল পৌরসভার অর্থায়নে পৌরভবনের সামনে ১৫ ফুট উচ্চতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন মেয়র এস,এম সিরাজুল হক আলমগীর।
নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের দিন পৌর মেয়র সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য পৌরসভার সামনে জাতির পিতার একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে। টাঙ্গাইল পৌরসভার নিজস্ব প্রকৌশলী দিয়ে সঠিক নিয়মনীতি মেনে এর ডিজাইন করা হয়েছে। ভাস্কর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি সে সময় সকলের পরামর্শ ও সহযোগিতার কামনা করেন। ভাস্কর্য নির্মাণ কাজ শুরু করার দুই মাস পর প্রায় ছয় ফুট পর্যন্ত কাজ হয়। এরপর হঠাৎ এক রাতের আধাঁরে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পর তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অবয়ব ফুটে উঠেনি। অসম্পূর্ণ বিকৃত অবয়বের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকে বিকৃত অবয়বের ছবি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। চাপের মুখে পৌর কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলে। এরপর ভাস্কর্যটি পুনরায় নির্মাণের কোন উদ্যোগ এখনো নেয়নি পৌরসভা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পিয়ন বলেন, রাত ১২টার পর মেয়রের নির্দেশে সকল লাইট বন্ধ করে দিয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মী দিয়ে ভাস্কর্য ভাঙা হয়। পরে তা ময়লার গাড়িতে করে ভাগারে ফেলা হয়।
সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের জন্যে মেয়র পেশাদার কোন ভাস্কর্যের শিল্পী নিয়োগ না করে মূর্তি বানানোর একজন সাধারণ কারিগর নিয়োগ করেন। ফলে যা হবার তাই হয়। ভাস্কর্যটি নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত চেহারা ভাস্কর্যে ফুটে ওঠেনি। বরং অনেকটা বিকৃতভাবে ফুটে উঠেছে এটি। এ ঘটনা জানাজানির পর পৌরসভার মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর তড়িঘড়ি ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতা বলেন, পৌরসভার বিপুল অর্থ ব্যয় করে জাতির জনকের বিকৃত ভাস্কর্য নির্মাণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে তাকে অবমাননা করার সামিল। তাছাড়াও বঙ্গবন্ধু খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তাকে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত পৌরসভা এককভাবে নিতে পারে না। ভাস্কর্য নির্মাণের ব্যাপারে সকলের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিৎ ছিল। জাতির জনক আমাদের অহংকার। তার নির্দেশে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্রহাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে কোনো গাফিলতি মেনে নেওয়া আমাদের জন্যে কষ্টকর বিষয়।
বিকৃত অবয়বের ভাস্কর্য নির্মাণের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা সোচ্চার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাংস্কৃতিক ও নাট্যকর্মী সাম্য রহমান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে যারা ভাস্কর্য শিল্পে অভিজ্ঞ তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিৎ ছিল। আমি জানিনা মেয়র সাহেব তা করেছিলেন কিনা। তাছাড়া বিকৃত ভাস্কর্য নির্মানের পেছনে ব্যয় হওয়া পৌরবাসীর করের এই বিপুল পরিমান অর্থ অপচয়ের দায়ভার এখন কে নিবে।
ভাস্কর্য নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া টাঙ্গাইল সদর উপজেলার তারুটিয়া এলাকার দুলাল পাল জানান, আমি চারজন কারিগর নিয়ে দুইমাস কাজ করেছিলাম। মজুরিবাবদ আমাকে দুইলাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে ৩২ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ভাস্কর্য নির্মাণে তার কোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে দুলাল পাল বলেন, আমি সিমেন্টের মূর্তি তৈরি করি। আমি কখনো বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করিনি।
জাতির জনকের ভাস্কর্য নির্মাণ ও পরে তা অপসারণের ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে পৌরবাসীর মাঝে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ ও ভেঙ্গে ফেলার বিষয়টি অনেকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। বিষয়টি কেন এতদিনেও মেয়র পৌরবাসীকে খোলাসা করে জানাননি তা নিয়েও অভিযোগ অনেকের।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ ও অপসারণের ব্যাপারে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল পৌরসবার মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর বলেন, আসলে ভাল কারিগর পাওয়া মুশকিল। যারা আমাদের বঙ্গবন্ধুর ভাল ভাস্কর্য বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা হয়নি। কিছুটা ত্রুটি বিচ্যুতি থাকায় আমরা তা অপসারণ করেছি। আগামীতে নিরালা মোড়ে নান্দনিক পরিবেশে জাতির জনক বঙ্গব্ন্ধুর ঐতিহাসিক একটি ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি। এছাড়া আপাতত কোনো সিদ্ধান নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণে পৌরসভার একটি পয়সাও খরচ হয়নি। যেহেতু আমি সাকসেস হইনি সেহেতু ভাস্কর্য নির্মাণে খরচ সম্পূর্ণই আমার পকেটের টাকা।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেউ। আগামীতে শহরের কোনো সুন্দর পরিবেশে বা সুন্দর জায়গায় জাতির জনকের একটি চমৎকার ভাস্কর্য নির্মাণ করার দাবি রয়েছে নতুন প্রজন্মের।
এফএইচ