দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও এলজিইডি সড়কের গ্যাজেটে স্থান পায়নি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের নাম। সড়কের নামের তালিকায় বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান নামে কোনো সড়ক নাই। যার কারণে তার স্মরণে ধলই চা বাগানে স্মৃতিসৌধের সড়কের প্রবেশ পথে স্থাপিত নামফলক ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিকের নামকরণ করা ওই সড়কের ফলক পুনস্থাপনে জেলা প্রশাসকের প্রতিশ্রুতির এক বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে সড়কের নামফলক ভেঙে দেওয়া এবং প্রশাসনের উদাসীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপমান করা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কমলগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা।
মুক্তিযুদ্ধের অদম্য সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী ২৮ অক্টোবর। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ধলই সীমান্তে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকার জন্য তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন। তার স্মরণে ১৯৯২ সালে ধলই চা বাগানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। সেইসঙ্গে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভানুগাছ চৌমুহনা থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান সড়ক।
ভানুগাছ চৌমুহনার বসানো হয় নামফলক। তার নামফলক ভেঙ্গে কমলগঞ্জ এলজিইডি রাস্তার উন্নয়ন কাজের উদ্বোধনী ফলকে নামকরণ করা হয়েছে আদমপুর জিসি ভানুগাছ জিসি ভায়া ইসলামপুর-মাধবপুর সড়ক। এলজিইডি সড়কের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের পর নতুন ফলক স্থাপন করে পরিবর্তন করা হয়েছে সড়কের নাম। এ সড়ক পথে প্রতিদিন উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও বিজিবির সদস্যরা চলাচল করেন। কিন্তু নামফলকটি সংস্কারে নেওয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। এতে পর্যটকসহ স্মৃতিসৌধে আসা লোকজনের বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভানুগাছ চৌমুহনায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামের ফলকটি আর নেই। এ সময় স্থানীয় লোকজন জানান, সড়কের নাম বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সড়ক। উনার নামে একটি নাম ফলক ছিল । রাস্তার কাজের পর যারা এই নতুন উদ্বোধনী ফলক বসিয়েছেন তারাই বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নাম ফলকটি ভেঙ্গে ফেলে রেখেছে। দীর্ঘদিন রাস্তার নামফলকটি নতুন নামকরণের নিচে রাখা ছিল। তবে কে বা কারা এই ভাঙ্গা নাম ফলকটি সরিয়ে নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক লোকজন বলেন, রাস্তার কাজের উদ্বোধনী ফলকের পাশে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে ফলক বসানোর জন্য একটি স্তম্ব করা কয়েছে। কিন্তু কি কারনে এখানে কোন ফলক লাগানো হয় নাই। তারা আরো বলেন, যাদের ত্যাগের বিনিমিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম আজ তাদের স্মৃতি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জন্য গড়াগড়ি খাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম জানে না বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগের ইতিহাস তাকে কমলগঞ্জে দেওয়া হয়নি যথার্থ সম্মান।
স্মৃতি সৌধে আসা পর্যটক সুয়েল আহমদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইডে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ শ্রীমঙ্গলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পারি এই জায়গায় বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছিলেন। তার এই স্মৃতিসৌধে আসার পথে নামফলক বা কোনো অনুস্মরক চিহ্ন নেই। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন যে একটি নাম ফলক ছিল। সেটা দীর্ঘদিন ধরে ভেঙ্গে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,দীর্ঘদিন একজন বীরশ্রেষ্ঠ এর নামফলক বসানোর বিষয়টি দেখছেন না। এটি খুবই দুঃখজনক।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের এলাকা বাতানগাছী গ্রামের আজিজুল ইসলাম এসেছেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি সৌধ দেখার জন্য, এ সময় তিনি জানান, ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে তিনি জম্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা আক্কাস আলী ও মাতা কায়দাছুন নেছা। অতি শৈশব থেকেই বাস্তবতার সঙ্গে তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়েছিল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুদ্ধ করে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত হন। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু তিনি যে এলাকায় তার জীবন উৎসর্গ করলেন এই এলাকার মানুষজন তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করে নাই।
স্মৃতিসৌধ দেখতে আসা মৌলভীবাজার জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভিপি আব্দুল মতিন বলেন, এই এলাকায় স্মৃতিসৌধ থাকার কারণে কমলগঞ্জ তথা মৌলভীবাজারবাসী গর্বিত। এই সড়কের প্রবেশ মুখে অর্থাৎ ভানুগাছ চৌমুহনায় তার নামে সড়কের নাম ফলক ছিল। এটা স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের নাম ফলক ভেঙ্গে আরেকটি ফলক বসানো কোনোভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আসীদ আলী কমলগঞ্জ চৌমুহনায় এই রাস্তার কোন নাম ফলক চোখে পড়ে নাই। তবে সব বিষয়ে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সড়ক নামেই ব্যবহার করা হয় বলে জানান তিনি।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা. মো. জয়নাল আবেদীন, স্মৃতিসৌধের সড়কের প্রবেশ পথে স্থাপিত নাম ফলক বিষয়ে কোন কথা না বললেও পর্যটকদের সুবিধার বিয়ষে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান।
মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লা জানিয়েছেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে সড়কের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নামকরণের জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পরিষদের সভায় এই বিষয়ে উপস্থাপন করে মন্ত্রাণালয় পর্যন্ত পৌচ্ছানোর জন্য। তবে নাম ফলক ভাঙ্গা বা অপসারনের বিষয়ে তিনি কোন কথা বলেননি।
কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক রফিকুর রহমান উপজেলা বলেন এই সড়ক তাদের পরিষদের নয়, তিনি নাম ফলক ভাঙ্গার জন্য এলজিইডির দিকে আঙুল তোলে আরো বলেন এই ফলকটিকে ভেঙ্গে রাস্তার উন্নয়ন কাজের উদ্বোধনী ফলক স্থাপন করা হয়েছে। যারাই এ কাজটি করেছে তা ঠিক করে নাই।
২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার আমবাসা থেকে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসে। পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
জেবি