দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার সুবরাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষককে পাশ কাটিয়ে এক সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি ও ওই সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান। অভিযোগের পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তবে অভিযোগের প্রায় তিন মাস পরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালামের চাকরির শেষ কর্মদিবস ছিল গত ১৪ জুন। ওই দিন তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
এর পরদিন ১৫ জুন বিকেল ৩টার দিকে বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী কয়েকজন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে সহকারী শিক্ষক বিশ্বনাথ দাসকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন বলে অভিযোগ করেন মোছাদ্দেক হাসান। বিশ্বনাথ দাস ওই এডহক কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, সহকারী প্রধান শিক্ষক মোছাদ্দেক হাসান সভাপতির কাছে দায়িত্ব দেওয়ার কাগজপত্র দেখতে চাইলে সভাপতি তাকে বে-আইনিভাবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানান। এরপর ১৬ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং ২০ জুন শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেন মোছাদ্দেক হাসান।
অভিযোগ পাওয়ার পর ২০ জুন বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্তে যান জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাদত হোসেন। তদন্ত শেষে মোছাদ্দেক হাসানকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি। পরে গত ২২ জুলাই ডাকযোগে তিনি ১২ ও ১৯ জুলাই তারিখের দুটি কৈফিয়ত তলবের চিঠি পান।
মোছাদ্দেক হাসানের দাবি, বিধি অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে সরিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরে তাকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে এডহক কমিটির এক অভিভাবক সদস্য দিলিপ কুমার পদত্যাগ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে চার সদস্যের এডহক কমিটিতে সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী ও শিক্ষক প্রতিনিধি বিশ্বনাথ দাসসহ দুজন সদস্য রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দুজনের সিদ্ধান্ত ও রেজুলেশনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বনাথ দাসের বিরুদ্ধে তার বি.এড সনদ জাল হওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তার বি.এডের কোনো জাল সনদ নেই।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে বিশ্বনাথ দাস বলেন, এডহক কমিটির সভাপতি তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তিনি সেই দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এডহক কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি হয়েও একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়া যায় কি না—এ প্রশ্নের জবাবে বিশ্বনাথ দাস বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। চার সদস্যের কমিটির দুজন সদস্য না থাকায় অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে সভাপতি তাকে কীভাবে দায়িত্ব দিলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সভাপতি তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তাই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
এডহক কমিটির সভাপতি সুরুজ হোসেন চৌধুরী কাউকে অবৈধভাবে বা জোর করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তিনি কাউকে অবৈধভাবে বা জোরপূর্বক দায়িত্ব দেননি। এডহক কমিটিতে বর্তমানে দুজন সদস্য রয়েছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তবে সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় তাকে পাশ কাটিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, চার সদস্যের কমিটির দুজন সদস্য না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে কি না এবং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে পারেন কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি সভাপতি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাদত হোসেন বলেন, কোনো বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় অন্য কোনো শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, সুবরাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে যা হয়েছে, তা বিধিবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সহকারী প্রধান শিক্ষককে দায়িত্ব না দিয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্টো তাকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এডহক কমিটি এভাবে তাকে বরখাস্ত করতে পারে না।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আরও জানান, তিনি সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে বিষয়টি তদন্ত করেছেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. এনামুল হক বিষয়টি নিয়ে সংসদে বক্তব্য দেন। এরপরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সমাধান না হওয়ায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য থাকলেও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সরেজমিন তদন্তে সহকারী প্রধান শিক্ষককে পাশ কাটিয়ে অন্য শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে এর প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
এমএস/