দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

তীব্র গরমে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে ঢাকা। যার বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, তীব্র তাপদাহের কারণে ঢাকার বার্ষিক মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশই নষ্ট হচ্ছে।
বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান, এটি ঢাকায় ওই সময়ের প্রতিবছর মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ। গরমের কারণে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, তা এই পূর্ণকালীন চাকরির হিসাবে বোঝানো হয়েছে।
বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরে চরম তাপের মধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষার উপায় শীর্ষক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ঢাকার এই দুর্ভোগের কথা বলা হয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়লে ঢাকার এ ক্ষতি আরও বাড়বে। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ হবে, এমন আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। ২০৮০ সালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান। তখন তাপের কারণে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বেড়ে হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, তাপমাত্রা বাড়ার কারণে কীভাবে মানুষের কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে। নষ্ট হচ্ছে মানুষের জীবনীশক্তি।
তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি শহরে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে তার তুলনা করা হয়েছে। শহরগুলো হলো—ঢাকা, নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারানিস। প্রতিবেদনে ঢাকার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে বলে দেখানো হয়।
কোন শহরে কত ক্ষতি: বিশ্বব্যাংকের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০৩০ সালে কলকাতার ক্ষতি হবে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। অর্থাৎ কর্মঘণ্টা হারানোর দিক থেকে ঢাকার ক্ষতি এই দুই শহরের তুলনায় বেশ বেশি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহে ক্ষতির তালিকায় নয়াদিল্লির পর আছে মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারানসি। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে মুম্বাইয়ের ক্ষতি হবে ২ লাখ ৪ হাজার পূর্ণকালীন কাজের সমান, চেন্নাইয়ের ১ লাখ ৪১ হাজার, আহমেদাবাদের ৯৯ হাজার, সুরাটের ৯৭ হাজার ও বারানসি ৫১ হাজার পূর্ণকালীন কাজের সমপরিমাণ।
বাংলাদেশের ক্ষতি: বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, তাপপ্রবাহের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যা প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমপরিমাণ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে এই ক্ষতির হার আরও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এখন যে তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে, তা অতীতের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। চরম তাপপ্রবাহ আগের চেয়ে আরও ঘন ঘন হচ্ছে। সেই সঙ্গে তা আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ কারণে মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব কেবল বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের ৭০ কোটির বেশি মানুষ এমন অঞ্চলে বাস করে, যেখানে বছরে অন্তত একদিন খোলা পরিবেশের তাপমাত্রা মানুষের সহনক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ১২ কোটি মানুষ প্রতিবছর অন্তত এক মাস এ ধরনের চরম তাপের সম্মুখীন হয়।
বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, মানুষের একধরনের সহজাত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আছে। তবে এ ধরনের চরম তাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় মূল্য দিতে হয়। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, বেড়ে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি। শরীর ঠান্ডা রাখতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। সর্বোপরি, দীর্ঘদিন ধরে এমন আবহাওয়ায় থাকার কারণে মানুষের শরীরে বাড়তি চাপ পড়ে।
তৈরি পোশাক খাতের ক্ষতি: প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তীব্র তাপের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন শিল্পে স্বল্পসুদ বা সহজ শর্তে দেওয়া ঋণ কীভাবে পুরো খাতের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তার উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশ।
চরম তাপের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আইএফসি ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাতের মোট রপ্তানি ক্ষতি হতে পারে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন কীভাবে একটি খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, বাংলাদেশ তা দেখিয়ে দিয়েছে। জ্বালানি, পানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও উন্নত কর্মপরিবেশে বিনিয়োগে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ বা পরিবেশবান্ধব রূপান্তর তহবিল চালু করে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে লিড সনদ পাওয়া কারখানার সংখ্যা ২৭০টির বেশি। আরও অনেক কারখানা এই সনদ পাবে।
তাপসহনশীলতা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, বিশ্বব্যাংক এই মত দিয়েছে। ভারতের আহমেদাবাদ শহরে ২০১৩ সাল থেকে হিট অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে চরম তাপপ্রবাহ থেকে স্থানীয় বাসিন্দা ও অর্থনীতির সুরক্ষায় ধারাবাহিক প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত পরিকল্পনার ফলে প্রথম দুই বছরেই তীব্র তাপপ্রবাহে মৃত্যুর হার ৪৭ শতাংশ কমেছে, আনুমানিক ২ হাজার ৩৮০ জনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ভারতের শহরগুলোয় তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কারণে প্রতি ১ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সুফল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা জোরদার করা গেলে একদিকে যেমন মানুষের জীবন সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়েও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা সম্ভব হবে।
অন্যদেরও শঙ্কা: আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত চাপে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজ হারাতে পারেন।
১৯ জুলাই প্রকাশিত ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং-আ কল ফর অ্যাকশন’শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের যে দুটি খাতে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, সেগুলো হলো কৃষি ও নির্মাণ। জার্মানিভিত্তিক গবেষণা ও নীতি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল এই প্রতিবেদন দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধরা যাক, কার্বন নিঃসরণ কমে গেছে, কিন্তু তাতেও কর্মঘণ্টা হারানোর হার কমবে না, বরং বাড়বে। তাপের কারণে কৃষি ও নির্মাণ খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বর্তমানের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন। কেননা তাঁদের বেশির ভাগেরই বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয়ের সুরক্ষা নেই।
এ ছাড়া প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের সবচেয়ে তাপ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হবে অন্যতম। ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় আর্দ্রতাজনিত তাপঝুঁকি থাকবে উচ্চ থেকে অতি উচ্চপর্যায়ে। এ সময় প্রতিবছর ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি: বাস্তবতা হলো, এই অতি তাপের কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। গরমের কারণে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি মানুষের জীবনীশক্তি বিনষ্ট হচ্ছে। অসুখ-বিসুখ বাড়ছে। কিন্তু দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে গরমজনিত অসুস্থতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ সব সময় গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অবস্থা এমন, পানিতে সারা শরীর নিমজ্জিত রেখে নাকটা ভাসিয়ে রাখা। ঢেউ এলে ডুবে যায়, এটা সুখকর অবস্থা নয়। যেকোনো ধাক্কায় তাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন।
পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, তীব্র তাপ সে রকম ধাক্কা দিতে পারে।
কে