দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, অর্থনীতিরও বিশাল এক মঞ্চ। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপে আগের যেকোনো আসরের তুলনায় বেশি ম্যাচ ও বেশি দর্শক থাকায় মাঠের বাইরেও ঘুরছে শত শত কোটি ডলার। তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়নি। কেউ হয়েছে বড় বিজয়ী, আবার কেউ গুনছে ক্ষতির হিসাব।
সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কাতারে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭৬০ কোটি ডলার আয় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই আয় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ মারিয়ন লাবোরের মতে, চার বছরের আয়চক্রে সংস্থাটির মোট আয় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সম্প্রচার স্বত্ব, লাইসেন্স, আতিথেয়তা, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট বিক্রি এবং সরকারি পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থায় ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার মাধ্যমে এই আয় আসে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন সমর্থকেরা। টিকিটের উচ্চমূল্য এবং চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ানোর নীতির কারণে অনেকেরই খরচ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচের টিকিটের সম্ভাব্য এক হাজার ডলার মূল্য নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছিলেন, তিনি এমন দাম দিয়ে টিকিট কিনতেন না।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের সরকারি টিকিটের মূল্য ছিল ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার। পুনর্বিক্রয় বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২০ লাখ ডলারেরও বেশি পর্যন্ত উঠেছে।
টিকিটের পাশাপাশি বিমানভাড়া, খাবার ও আবাসনের ব্যয়ও বেড়েছে। আলোচনায় আসে নিউ জার্সি ট্রানজিটের ট্রেনভাড়া। সাধারণ সময়ে ১২ দশমিক ৯০ ডলারের যাতায়াত ভাড়া বিশ্বকাপ চলাকালে বেড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছায়। সমালোচনার মুখে তা কিছুটা কমানো হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ছিল।
সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের জন্যও বিশ্বকাপ বড় আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। দর্শকসংখ্যা এবং বিজ্ঞাপনের চাহিদা বাড়ায় তারা উল্লেখযোগ্য আয়ের সম্ভাবনা দেখছে।
এবারের বিশ্বকাপে চালু হওয়া পানীয় বিরতির সময়ও নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচার স্বত্বের জন্য ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করা সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান সেই বিরতিকে পৃষ্ঠপোষকের নামে প্রচার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের মূল্য সাধারণত ২ থেকে ৩ লাখ ডলার, আর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোতে তা বেড়ে সাড়ে ৭ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বিশ্বকাপের সরকারি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান ও একটি আন্তর্জাতিক কোমল পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানও আলোচনায় এসেছে। যেমন, সান ফ্রান্সিসকোর একটি স্টেডিয়ামের বাইরে একটি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ঢেকে দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বাণিজ্যিক দিক থেকে সফলদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যামও। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবটির সহ-মালিক, সেটি দেশটির সর্বোচ্চ মূল্যমানের ক্লাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ক্লাবটির মূল্য প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার।
বিশ্বকাপ আয়োজক শহরগুলোয় পর্যটক ও সমর্থকদের ভিড় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার যোগ হবে। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যার বেশির ভাগই আতিথেয়তা ও আবাসন খাতে।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার বাডজিয়েরের মতে, এমন বড় ক্রীড়া আসর দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লাভ এনে দেয় না। বরং অনেক পর্যটক ভিড় এড়াতে ওই সময় ভ্রমণ করেন না। তার ভাষায়, ‘এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, কিন্তু সম্পদ সৃষ্টি করে না।’
হোটেল খাতও প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি। আয়োজক শহরগুলোতে প্রত্যাশিত কক্ষ বুকিং না হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ভ্যাঙ্কুভারে সাতটি ম্যাচ আয়োজন সত্ত্বেও জুন ও জুলাই মাসে বুকিং আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল মালিকদের সংগঠনও অভিযোগ করেছে, বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেদের প্রয়োজনের জন্য অতিরিক্ত কক্ষ আগাম সংরক্ষণ করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেছিল। তবে সংস্থাটি এই অভিযোগ স্বীকার করেনি।
অন্যদিকে সবচেয়ে লাভবান খাতগুলোর একটি হচ্ছে ক্রীড়াভিত্তিক বাজির ব্যবসা। আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারির হিসাবে, এবারের বিশ্বকাপে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারের বাজি ধরা হতে পারে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। দলসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ম্যাচ বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষক চ্যাড বেইননের মতে, এখন ম্যাচ শুরুর আগের বাজির চেয়ে খেলা চলাকালে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাজি ধরার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর দেশটির অনেক অঙ্গরাজ্যে ক্রীড়া বাজি বৈধ হওয়ায় এই বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এটি এখনো বৈধ নয়। সেখানে বিকল্প পূর্বাভাসভিত্তিক বাজার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিবিসি
/অ