দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

৪৮ দলের বিশ্বকাপের শুরুতেই একের পর এক চমক দেখা যাচ্ছে। তুলনামূলক কম র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলো শুধু লড়াইই করছে না, বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে পয়েন্টও কেড়ে নিচ্ছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, ঘানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো স্পেন, ইকুয়েডর, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, এসব কি শুধুই ভাগ্যের জোর, নাকি নিখুঁত পরিকল্পনা ও কৌশলগত বাস্তবায়নের ফল? ম্যাচগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, ছোট দলগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েকটি অভিন্ন কৌশল।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেপ ভার্দের স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশটি ৪-৫-১ রক্ষণাত্মক বিন্যাসে পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেনকে আটকে রাখে। তাদের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মধ্যে দূরত্ব ছিল খুবই কম, ফলে স্পেন মাঝ দিয়ে আক্রমণের সুযোগ পায়নি।
সাধারণত প্রতিপক্ষকে ওপরে টেনে তুলে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে বল পেছনে খেলতে অভ্যস্ত দখলভিত্তিক দলগুলো। কিন্তু কেপ ভার্দে সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে এবং স্পেনের রক্ষণভাগ বল নিয়ে সামনে এলেও অযথা চাপ সৃষ্টি করেনি। ফলে স্পেন বাধ্য হয় ডান-বাম দিক অথবা লম্বা পাসের ওপর নির্ভর করতে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও একই কৌশল নেয় ঘানা। জর্ডান আয়িউ কিছুটা ওপরে থেকে নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে পাহারা দিলেও দলের বাকি খেলোয়াড়রা নিজেদের বক্সের সামনে দুই সারিতে অবস্থান নেন। মাঝখানে কোনো ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে দেননি তারা।
এ দুই দলের রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলার প্রতিফলন দেখা যায় চাপ প্রয়োগের পরিসংখ্যানেও। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের গড় চাপ-সূচক ছিল ৫১ দশমিক ২, যেখানে স্পেনের ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৯। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ১৫ মিনিটে ঘানার সূচক ছিল ৬২। অর্থাৎ ছোট দলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রতিপক্ষকে বলের দখল দিয়েছে, কিন্তু নিজেদের রক্ষণভাগ ভাঙতে দেয়নি।
তবে ম্যাচের শেষ দিকে কেপ ভার্দে ও ঘানা চাপ বাড়ায়। তখন তারা সুযোগ বুঝে জয়ের জন্য ঝুঁকি নিতেও পিছপা হয়নি।
বিশ্লেষণে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—রক্ষণভাগে পাঁচজন খেলোয়াড় থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। স্পেনের কাছে সৌদি আরবের ৪-০ গোলে হারের ম্যাচটি সেটিই প্রমাণ করেছে।
সৌদি আরবের খেলোয়াড়রা বলের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ায় মাঠের প্রস্থজুড়ে ভারসাম্য নষ্ট হয়। স্পেন দ্রুত এক পাশ থেকে অন্য পাশে বল সরিয়ে দুই বনাম এক পরিস্থিতি তৈরি করে। সেই কৌশল থেকেই আসে তাদের তৃতীয় গোল।
একই দুর্বলতা দেখা যায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সুইডেনের ৫-১ গোলে হারের ম্যাচেও। ৫-৩-২ বিন্যাসে মাঝমাঠে মাত্র তিনজন খেলোয়াড় থাকায় প্রস্থজুড়ে রক্ষণ সামলাতে পারেনি তারা। পরে ৪-৫-১ বিন্যাসে ফেরার পর কিছুটা উন্নতি দেখা যায়।
ছোট দলগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল গোলরক্ষকের কাছ থেকে ছোট পাসে আক্রমণ শুরু করা। কেপ ভার্দে, ইরাক ও দক্ষিণ আফ্রিকা গোলকিক থেকে ছোট পাস খেলেই প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে আনে। খেলোয়াড়দের দূরে দূরে অবস্থান করানোর ফলে একে একে চাপ দিতে গিয়ে বড় দলগুলোর খেলোয়াড়দের অনেকটা দৌড়াতে হয়েছে। সেই সুযোগে মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগে ফাঁকা জায়গায় বল পৌঁছে দিয়েছে ছোট দলগুলো।
অবশ্য এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা মেক্সিকোর বিপক্ষে এবং ইরাক নরওয়ের বিপক্ষে নিজেদের অর্ধে বল হারিয়ে গোল হজম করেছে। তবে একই কৌশলে তারা একাধিক ভালো সুযোগও তৈরি করেছে। শেষ মুহূর্তে আরও নিখুঁত হতে পারলে ম্যাচের ফল ভিন্নও হতে পারত।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়া উঁচুতে উঠে চাপ সৃষ্টি করলেও দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের পরিকল্পনা বদলায়নি। নির্ভুলভাবে লম্বা পাস খেলে দ্রুত আক্রমণে গিয়ে তারা সেই গোলটি আদায় করে, যা তাদের পরের পর্বে তুলে দেয়।
সবশেষে, কৌশলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও বড় ভূমিকা রেখেছে। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ গোলরক্ষণের মাধ্যমে কেপ ভার্দেকে ঐতিহাসিক ড্র এনে দেন। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম এক ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের রেকর্ড স্পর্শ করেন এবং নিজের দলকে প্রথম পয়েন্ট এনে দেন।
/অ