দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বর্তমানে অনেকেই বাড়িতে পশুপালন করে থাকেন। বেশিরভাগ মানুষ এটি শখ থেকে করেন। যেমন- বিড়াল, কুকুর, পাখি, অ্যাকুরিয়ামে মাছ। এগুলোর মতো অনেককে খরগোশও পালন করতে দেখা যায়। এটি তৃণভোজী, শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের প্রাণী। সাধারণত স্বল্প ব্যয় ও কম স্থানে সহজেই পালন করা যায়। তবে এটি পালতে হলে আপনাকে এর সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে।
যদিও বাংলাদেশে খরগোশ পালন, অন্য পোষা প্রাণীর তুলনায় কম। তবে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এটি পালন করা হচ্ছে। এর মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। বিলাসবহুল হোটেল, রেস্তোরা এবং বড় বড় ভোজসভায় এর যথেষ্ট কদর রয়েছে। খরগোশের মাংসে প্রোটিন, শক্তি, মিনারেল ইত্যাদির পরিমাণ বেশি এবং ফ্যাট, সোডিয়াম এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম।
তাছাড়া গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে খরগোশ পালনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আয়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। খরগোশের মাংস একদিকে যেমন প্রাণীজ আমিষের একটি চমৎকার উৎস হতে পারে। অন্যদিকে অভাবগ্রস্ত নারী ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের একটি বিরাট উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু, তার আগে আপনাকে খরগোশ পালনের সঠিক নিয়ম-কানুন জানতে হবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক-
প্রথমেই জেনে নিন খরগোশ কোথায় পাবেন-
ঢাকার কাঁটাবন, মিরপুর, কাপ্তান বাজারসহ বিভিন্ন পশু-পাখি ও অ্যাকুরিয়ামের দোকানে পাওয়া যায়। ঢাকার বাইরে গাজীপুরের টঙ্গী মার্কেট, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়ও পাওয়া যায়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে কিনতে পাওয়া যায়।
যেভাবে পালন করবেন:
ঘরের বারান্দা, বাড়ির ছাদ কিংবা আঙিনায় ছোট আকারের শেড তৈরি করে খরগোশ পালন করতে পারবেন। এটি দুটি পদ্ধতিতে করা যায়। যেমন-
১. লিটার পদ্ধতি:
কমসংখ্যক খরগোশ পালনের জন্য এ পদ্ধতি উপযোগী। এর জন্য মেঝে কংক্রিটের হওয়া উচিত। খরগোশ মাটি খুঁড়ে গর্ত বানায়। লিটার পদ্ধতিতে মেঝের ওপর ৪-৫ ইঞ্চি পুরু করে তুষ, কাঠের ছিলকা অথবা ধানের খড় ছড়িয়ে দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে পালন করতে হলে একসঙ্গে ৩০টির বেশি করা ঠিক নয়। পুরুষ খরগোশ আলাদা ঘরে রাখতে হবে। না হলে এদের সামলানো খুব কঠিন। শুধু প্রজননের জন্য ১০-১৫ মিনিটের মতো পুরুষ খরগোশকে স্ত্রী খরগোশের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়।
২. খাঁচা পদ্ধতি:
খাঁচা পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে খরগোশ পালনের জন্য বেশ জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে লোহার পাত দিয়ে তৈরি ৩-৪ তাকবিশিষ্ট খাঁচা বেশি উপযোগী। খরগোশের জন্য জায়গা রেখে প্রতি তাকে খোপ তৈরি করতে হবে।
যেমন- পূর্ণবয়স্ক খরগোশের খাঁচা ১.৫ ফুট লম্বা, ১.৫ ফুট চওড়া এবং ১.৫ উঁচু হওয়া উচিত। এতে দুটি খরগোশ পালন করা যাবে। আবার বড় আকারের খরগোশের জন্য ৩ ফুট লম্বা, ১.৫ ফুট চওড়া এবং ১.৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট খাঁচাই যথেষ্ট।
খরগোশের জন্য কী পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন?
১. পূর্ণবয়স্ক পুরুষ খরগোশের জন্য প্রয়োজন ৪ বর্গফুট জায়গা।
২. পূর্ণবয়স্ক মা খরগোশের জন্য প্রয়োজন ৬ বর্গফুট (প্রসূতি ঘরসহ)।
৩. বাচ্চা খরগোশের জন্য প্রয়োজন ১.৫ বর্গফুট।
খরগোশের খাবার কেমন হবে?
বিভিন্ন বয়স ও প্রজাতির খরগোশের খাদ্য গ্রহণ ও পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। একটি বয়স্ক খরগোশের খাদ্যতালিকায় এমন হতে হবে, যাতে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ ক্রুড প্রোটিন, ১৪ শতাংশ ফাইবার, ৭ শতাংশ মিনারেল ও ২৭০০ কিলো ক্যালরি/কেজি পুষ্টির জোগান সুনিশ্চিত হয়।
খাবারের পরিমাণ:
১. বয়স্ক খরগোশের জন্য প্রতিদিন ১৩০-১৪৫ গ্রাম খাবার প্রয়োজন।
২. স্তন্যপান করানো খরগোশের জন্য প্রতিদিন ২৫০-৩০০ গ্রাম জরুরি।
৩. বাড়ন্ত খরগোশের জন্য প্রতিদিন ৯০ গ্রাম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।
যেসব খাবার দেওয়া যাবে:
১. কচি ঘাস, লতা-পাতা, গাজর, মুলা, শস্যদানা, মিষ্টি আলু, শসা, খড়কুটো, তরকারির ফেলনা অংশ, গম, ভুসি, কুড়া, খৈল, সয়াবিন, দুধ, পাউরুটি, ছোলা এদের নিত্যদিনের খাবার।
২. ঘাস ও শাক সবসময় শুকনা বা ঝকঝকে অবস্থায় দিতে হবে।
৩. গম বা ছোলা অল্প সেদ্ধ করে ভুসির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভালো হয়।
খরগোশ অসুস্থ কিনা যেভাবে বুঝবেন:
১. চোখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলে
২. কান খাড়া না থাকলে
৩. লোম শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে গেলে
৪. খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলে
৫. দৌড়ঝাঁপ কমিয়ে দিলে এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে।
খরগোশ পালনের সুবিধা:
১. এটি দ্রুত বর্ধনশীল প্রাণী।
২. একসঙ্গে ২-৮টি বাচ্চা প্রসব করে।
৩. একমাস পরপর বাচ্চা প্রসব করে।
৪. খাদ্য দক্ষতা অপেক্ষাকৃত ভালো।
৫. মাংস উৎপাদনে পোল্ট্রির পরেই খরগোশের অবস্থান।
৬. কম জায়গায় কম খাবারে পালন করা যায়।
৭. কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব।
৮. খরগোশের মাংস বেশি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন।
৯. রান্না ঘরের উচ্ছিষ্ট, ঘাস ও লতা-পাতা এর খাবার।
১০. পারিবারিক শ্রমের সফল ব্যবহার করা সম্ভব।
১২. হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ভোজসভায় এর মাংসের অনেক কদর।
খরগোশ পালনে ঝুঁকিপূর্ণ দিকসমূহ:
১. উৎপাদিত দ্রব্যের বাজারজাতকরণে সমস্যা।
২. খরগোশের মাংস সবাই খেতে চায় না।
৩. খরগোশ অসুস্থ হলে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
৪. খরগোশের ইউরিনে ভীষণ গন্ধ থাকে।
৫. বাচ্চার যত্নে বিশেষ করে প্রথম ১০ দিন সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
খরগোশের রোগ ও প্রতিকার:
১. মিক্সোমাটোসিস
এটি খরগোশের একটি প্রাণনাশক রোগ। আঙ্গোরা, ফ্লেমিস রাবিট, জ্যাক রাবিট ইত্যাদি প্রজাতির খরগোশের এই রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তুলনামূলক বেশী। এটি পক্স ভাইরাস শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এ রোগে আক্রান্ত অবস্থায় খরগোশের প্রজনন ঘটালে মুখ, নাক, কান, ঠোঁট, চোখের পাতা ইত্যাদি অঙ্গে ইডিমা হয়। কান দেহ থেকে ঝুলে পড়ে। কখনও কখনও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হয়।
এ রোগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। রোগের লক্ষণ অনুযায়ী চিকিত্সা করতে হয়। সেফালেক্সিন বা এনরোফ্লক্সাসিন পানির সঙ্গে মিশিয়ে খরগোশকে খাওয়ানো যেতে পারে।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
১. অসুস্থ খরগোশকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
২. ফর্মালিন বা ৩ শতাংশ সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড দিয়ে খরগোশের খামার জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৩. প্রতিষেধক টীকা পাওয়া গেলে খরগোশকে টীকা দিতে হবে।
২. সালমোনেল্লেসিস:
সালমোনেল্লা টাইফিমুরিয়াম নামক ব্যাকটেরিয়া এই রোগের কারণ। এ রোগে খরগোশের দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় ও পাতলা পায়খানা হয়। গর্ভবতী খরগোশের গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে মৃত্যুহার অনেক বেশী।
সুস্থতার জন্য এনরোফ্লক্সাসিন বা সেফালোক্সিন বা সিপ্রোফ্লক্সাসিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
১. খরগোশের খামার পরিষ্কার রাখতে হবে।
২. দুষিত পানি বা খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।
৩. মৃত খরগোশকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
৪. খরগোশের খামারটিকে ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৩. পরজীবী ঘটিত রোগ:
হেপাটিক কক্সিডিওসিস আইমেরিয়া স্টাইডি নামক পরজীবী এই রোগের কারণ। এটি সাধারণত কম বয়স্ক খরগোশের হয়।
এই রোগের চিকিত্সার জন্য সালফাকুইনক্সালিন ডেরিভেটিভ কার্যকরী ওষুধ। খাদ্যে শতকরা ০.০২৫ ভাগ ও পানিতে শতকরা ০.০৪ ভাগ হিসাবে এটি খরগোশকে খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়।
এস