দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের চান্দাইকোনায় জনবসতি এলাকা ও তিন ফসলি জমিতে গড়ে ওঠছে বিসমিল্লাহ নামে একটি অটো রাইস মিল। এতে করে ঐ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থাপনের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়াসহ আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা। বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের চান্দাইকোনা এলাকার ৫৭ শতক ফসলি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে অটো রাইস মিল স্থাপনের কাজ চলছে।
এই অটো রাইস মিলটি চালু হলে মিলের বর্জে ফসলি জমিসহ এলাকার পরিবেশ নষ্ট হবে। অটোরাইস মিলের ধোঁয়া ও ছাইয়ে বয়স্ক ও শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশে অবস্থিত চান্দাইকোনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদান ব্যাহত হবে। এ কারণে মিলটি বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে এস.এম সোহাগ নামের এক স্থানীয় কৃষক।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চান্দাইকোনা বাজারের পাশে জনবসতি এলাকায় পরিবেশ আইন ও নিয়মনীতি না মেনে তিন ফসলি জমিতে রিয়া নামে অটো মিল গড়ে তোলা হয়েছে। এই অটো মিলের অন্তরালে আনোরুল ইসলাম গংরা অটো রাইস মিল স্থাপন করছে।
এ মিলটি চালু হলে এর বর্জ্যমিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি কালো ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে বাতাসে ছাই হয়ে উড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, ইউনিয়ন পরিষদ ও পল্লীবিদ্যুৎ সাব স্টেশনসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হবে। একইসঙ্গে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় জনসাধারণের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সেইসঙ্গে নষ্ট হবে তিন ফসলি জমি। একইসঙ্গে নষ্ট হবে জমিতে থাকা ঘর-বাড়ি, গাছপালা। এ কারণে অপরিকল্পিতভাবে দুটি অটো রাইস মিল বন্ধসহ আইনগত ব্যবস্থার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জমির মালিক এস.এম সোহাগ, আব্দুর রাজ্জাক শেখ, নিজাম উদ্দিন আকন্দ, জহুরুল ইসলাম আকন্দ, মামুন আকন্দ, আবু ওয়াহেদ সোহেল সরকার, আবু হাসেম, দুলাল শেখসহ বেশ কয়েকজন।
শনিবার (১৮ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার রায়গঞ্জ উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে ১৫০টি চালকল ও অটো রাইস মিল রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র দুটির। বাকি চালকলগুলো অবাধে চলছে। এতে ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক অঞ্চলে স্থাপনের কারণে পরিবেশের ছাড়পত্র পায়নি অধিকাংশ চালকল। পরিবেশের ছাড়পত্র ও অনুমোদন ছাড়াই দাপটের সঙ্গে চলছে এসব চালকল। এ সকল চালকলগুলো পরিবেশের নিয়মনীতি মেনে স্থাপন করা হয়নি। এ কারণে কারখানার গরম পানি, ছাই ও দূষিত বর্জ্যে আবাদি জমি ও নদী দূষণ হচ্ছে।
উপজেলার চান্দাইকোলা ইউনিয়নের মৃত কায়ছার আলী সরকারের ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও আব্দুর রউফসহ প্রভাবশালী ১৫ জন একত্র হয়ে অনুমতি ছাড়াই অটো রাইস মিল নামে একটি বড় মিল তৈরি করেছে।
চান্দাইকোনা গ্রামের বাসিন্দা হাসান সরকার বলেন, মিলের কাছাকাছি ১০ মিনিট দাঁড়ানো যায় না। ছাই উড়তে থাকে পুরো এলাকায়। গাছপালার পাতা লাল হয়ে গেছে। গাছে নতুন করে কোনো ফল ধরে না। এলাকায় শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছে। মিলের ছাই উড়ে আমাদের খাবারের ভেতরে পড়ে সেই খাবার নষ্ট হয়। কিন্তু একই এলাকায় আরেকটি বড় অটো রাইস মিল তৈরি হচ্ছে। এই মিলটি চালু হলে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
একই গ্রামের মৃত কামাল সেখের ছেলে রাজ্জাক শেখ বলেন, রিয়া রাইস মিলের কারণে বর্তমানে বাড়িতে বসবাস করা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিলের উড়ন্ত ছাই, তুষ ও কুড়া ঘরের হাঁড়ি-পাতিলে গিয়ে পড়ে। বাড়ি ঘর, গাছপালা ও ফসলি জমি ছাইয়ের আবরণে কালো বর্ণের হয়ে গেছে। মিলের কারণে এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ চোখের বিভিন্ন রোগসহ শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিলের পাশের এক মুদি দোকানদার বলেন, মিলের উড়ন্ত ছাই, তুষ ও কুড়া রাস্তায় চলাচলকারী পথচারী ও বিভিন্ন গাড়ি চালকদের চোখে পড়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। এতে অনেক সময় রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটছে।
জানতে চাইলে রিয়া অটো রাইস মিলের মালিক আব্দুর রউফ বলেন, এখানে সব নিয়ম মেনেই মিলটি চালু করা হচ্ছে। সবকিছুর অনুমোদন আছে আমাদের। তবে মিলের কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো দ্রুত নিরসন করবেন বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে অনুমোদনহীন তৈরি হওয়া অটো রাইস মিলের পার্টনার বাবু সরকার বলেন, আমাদের কোনো কাগজপত্র নেই। নির্মাণ কাজ শেষ হলে কাগজপত্র তৈরি করে সকল দপ্তরে আবেদন জমা দেওয়া হবে। সেই মোতাবেক কাজ চলছে।
এ বিষয়ে চান্দাইকোনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুজ্জামান সরকার অভিযোগ করে বলেন, স্কুল খোলার সঙ্গে সঙ্গে কালো ধোঁয়ায় স্কুলের আশপাশে অন্ধকার হয়ে বাতাস দূষিত করে। এছাড়া অন্যান্য কারণে চরম দুর্গন্ধ হয়। এতে আমাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্কুলের আশেপাশে আরও কয়েকটি চাল কল আছে। সেই চাল কলের কালো ধোঁয়া, ছাই ও দুর্গন্ধ পানির কারণে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। সেখানে যদি আবার অটো রাইস মিল তৈরি হয় তাহলে এখানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হবে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভুঁইয়াগাঁতী জোনাল অফিসের (ডিজিএম) ছোলাইমান হোসেন জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ওই মিলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যাবে না। তবে এক মিলের লাইন কৌশলে মালিকপক্ষ যদি অন্য মিলে নিতে চায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৃপ্তি কণা মণ্ডল জানান, ওই রাইস মিলের ব্যাপারে স্থানীয়রা লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। সেই অভিযোগের আলোকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি সঠিক তদন্ত না করায় পুনরায় আবার তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্তর জন্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ঐ অটো রাইস মিলটি চালু করা যাবে না। যদি কেউ অটো রাইস মিলটি চালু করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) বাবলু কুমার সূত্রধর বলেন, অটো রাইস মিল ও ইটভাটার ধোঁয়া ও ছাই পরিবেশ ও ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রায়গঞ্জ উপজেলায় এর প্রভাব বেশি পড়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরিবেশ ও খাদ্য অধিদপ্তরকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক আব্দুর গফুর জানান, কাজ বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদের নির্দেশ না মেনেই আমরা ঢাকায় মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আবু আশরাফ মো. ছালেহ্ বলেন, এক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ অন্য প্রতিষ্ঠানের নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। যদি রিয়া ও বিস্মিল্লাহ অটো রাইস মিলের মালিক গংরা এই ধরনের কাজ করে থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কাজের সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কোনো লোক জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
জেলা খাদ্র নিয়ন্ত্রণ অফিসার রিয়াজুর রহমান রাজু বলেন, আমি নতুন এসেছি। এ অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে অটো রাইস মিলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকলে তাদের লাইসেন্স দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, ফসলি জমিতে যদি কেউ অটো রাইস মিল স্থাপন করে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেবি