দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য ইবাদতে নিয়মিত হওয়া বা 'ইস্তেকামাত' বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমল শুরু করলেও কিছুদিন পর তাতে ভাটা পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে অল্প আমল হলেও তা নিয়মিত করা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
ঈদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই অনেক ক্ষেত্রে ইবাদতের আগ্রহে ভাটা পড়ে। অনেকেরই ফজরের জামাত মিস হতে শুরু করে, কোরআন শরিফ রাখা হয় উপরের তাকে, আর নফল অভ্যাসগুলোও যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
রমজান-পরবর্তী সময়ে ইবাদতে ধারাবাহিকতা রক্ষার ১০টি কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা: যেকোনো ভালো কাজের সফলতার জন্য স্রষ্টার সাহায্য অপরিহার্য। হেদায়াতের ওপর টিকে থাকা নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত।
পবিত্র কোরআনে প্রজ্ঞাবানদের একটি দোয়া বর্ণিত হয়েছে, “হে আমাদের পালনকর্তা, সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনিই পরম দাতা।” (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ৮)
২. সৎ মানুষের সাহচর্য: মানুষের স্বভাব তার পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে। রমজানে মসজিদে সবার সঙ্গে ইবাদত করার কারণে যে গতি তৈরি হয়, একা থাকলে তা ধরে রাখা কঠিন।
তাই রমজানের পরেও এমন বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা উচিত যারা ইবাদতে উৎসাহিত করে। নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা বা সেমিনারে অংশগ্রহণ করা মনকে সজীব রাখে।
৩. মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী পাঠ: সাহাবিদের জীবন এবং ইসলামের ইতিহাসে যারা আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তাদের জীবনী পাঠ করলে মনে নতুন করে হিম্মত ও প্রেরণা তৈরি হয়।
বিশেষ করে সাহাবিদের ইবাদতের একাগ্রতা ও ত্যাগের গল্পগুলো আমাদের অলসতা কাটাতে সাহায্য করে। এটি মনের ভেতর এক ধরনের জেদ তৈরি করে যে, “তারা পারলে আমি কেন পারব না?”
৪. গঠনমূলক অডিও-ভিডিও শোনা: বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভালো কথা শোনার অনেক সুযোগ রয়েছে। কাজের ফাঁকে বা যাতায়াতের সময় বিজ্ঞ আলেমদের গঠনমূলক আলোচনা বা অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য শুনলে ইমানের তেজ বজায় থাকে।
এটি মনকে দুনিয়াবি ফেতনা থেকে দূরে রাখতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
৫. ফরজ ইবাদতে আপসহীনতা: রমজানে আমরা অনেক নফল ইবাদত করি। কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার পর অনেক সময় আমরা ফরজের ক্ষেত্রেই অলসতা করে ফেলি। মনে রাখা দরকার, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো ফরজ পালন করা।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো পড়ার পাশাপাশি রমজানের কাজা রোজা থাকলে তা দ্রুত পালন করে নেওয়া উচিত। ফরজের ভিত্তি মজবুত থাকলে নফলের ইমারত গড়া সহজ হয়।
৬. অল্প হলেও নিয়মিত নফল আমল: ইবাদতের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্বভাব হলো—আমরা একদিন অনেক ইবাদত করি, আবার কয়েক দিন কিছুই করি না।
অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়; যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
প্রতিদিন অন্তত দুই রাকাত নফল নামাজ বা সামান্য দান করার অভ্যাস গড়ে তুললে আধ্যাত্মিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না।
৭. কোরআনের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখা: রমজানে আমরা অনেকেই কোরআন খতম দিই। কিন্তু এরপর কোরআন তেলাওয়াত একেবারে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা হলেও অর্থসহ তেলাওয়াত করা এবং মুখস্থ করা সুরাগুলো নামাজে পড়া উচিত।
কোরআন হলো মুমিনের হৃদয়ের খোরাক; এটি নিয়মিত পাঠ না করলে হৃদয়ে মরিচা ধরে।
৮. জিকিরের অভ্যাস: সব সময় ইবাদতে মগ্ন থাকা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু জিকির ও ইস্তিগফার করা খুব সহজ। হাঁটাহাঁটি বা অবসরে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করলে অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং ইমান শক্তিশালী হয়। জিকির হলো আত্মার জীবনীশক্তি।
৯. আত্মিক কলুষতা থেকে দূরে থাকা: অসৎ সঙ্গ, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল বিনোদন আমাদের ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয়। রমজানে আমরা এসব থেকে দূরে ছিলাম বলেই ইবাদতে মন বসত।
রমজানের পরেও যদি আমরা চোখে ও কানের হেফাজত না করি, তবে আমলের জ্যোতি হারিয়ে যাবে। কুপ্রবৃত্তি থেকে দূরে থাকা ইবাদতে অবিচল থাকার অন্যতম শর্ত।
১০. দ্রুত তওবা করা: মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় আলস্য বা শয়তানের প্ররোচনায় আমরা খেই হারিয়ে ফেলি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত ফিরে আসা।
কোনো ভুল হয়ে গেলে বা ইবাদতে ঘাটতি দেখা দিলে নিরাশ না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নতুন উদ্যমে শুরু করা উচিত। আল্লাহ–তাআলা তওবাকারীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন।
পূর্বসূরি বুজুর্গ ব্যক্তিরা বলতেন, “সেই জাতি কতই না মন্দ, যারা রমজান ছাড়া আল্লাহকে চেনে না!” অর্থাৎ আমাদের ইবাদত যেন কেবল মৌসুমি না হয়। রমজান আমাদের জন্য একটি শুরুর বিন্দু, শেষের নয়।