দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভোটাররা যাচ্ছেন এমন এক নির্বাচনে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। দীর্ঘদিনের শাসক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনী মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী জোট, যাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ইসলামপন্থী শক্তিগুলো তাদের সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায়। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা, হত্যার নির্দেশ এবং দমনমূলক সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে আছেন। বিচারাধীন থাকায় আওয়ামী লীগ ও দলটির প্রতীক নৌকা এবার প্রথমবারের মতো ব্যালটে নেই।
এই শূন্যতায় জামায়াতে ইসলামী ইসলামপন্থী ভোট একত্র করার উদ্যোগ নিয়েছে। আসন বণ্টন নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে সরে গেলেও জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামপন্থী দলগুলো নির্বাচনে দুর্বল হলেও সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কাছাকাছি। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির হিসাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য ভোট ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ, আর জামায়াতের জোটের ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে অন্য জরিপগুলোতে আসনের হিসাবে বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, দেশ কেন্দ্র–বাম থেকে সরে এখন কেন্দ্র–ডান বা আরও ডানদিকে ঝুঁকেছে এবং মানুষ বুঝে নিয়েছে, যে–ই জিতুক না কেন, সামনে ডানঘেঁষা রাজনীতির বাংলাদেশই বাস্তবতা হবে।
একসময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা বিএনপি এবার ইসলামপন্থী জোটের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেতে দুই পক্ষই জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বিএনপি জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে জামায়াত এনসিপির সঙ্গে জোট করে নতুন ভোটব্যাংক গড়তে চাইছে।
এনসিপির এই জোটই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। এক বছর আগেও দলটি এককভাবে নির্বাচন করার কথা বলেছিল এবং জামায়াতের নেতৃত্বে আস্থা নেই বলে জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতায় এক বছরের মধ্যে সারা দেশে সংগঠন গড়া সম্ভব না হওয়ায় তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেছে বলে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি আদর্শগত নয়, বরং কৌশলগত জোট এবং এতে নির্বাচন–পরবর্তী সংস্কারে প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই সিদ্ধান্তে এনসিপির ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছেন।
নির্বাচন ঘিরে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও পুরোনো বিতর্ক ফিরে এসেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও পরে সামরিক শাসনে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। সাম্প্রতিক সংস্কার প্রস্তাবে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রাখার সুপারিশ থাকায় বামপন্থী দলগুলো আপত্তি তুলেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতা উপযুক্ত নয়।
নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে। বহু বছর নারী প্রধানমন্ত্রী থাকার পর এবার কোনো বড় দলের নেতৃত্বে নারী নেই। দলগুলো সংসদে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও কেউই তা পূরণ করেনি। বিএনপি দিয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, জামায়াত দেয়নি একজনও। জামায়াত নেতাদের নারীবিষয়ক মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং নারীবাদী সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। জামায়াত বিএনপিকে ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করার অভিযোগ করছে, বিএনপি জামায়াতকে তাদের আগের জোট সরকারের সময় দুর্নীতির রেকর্ডের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গড়লেও অনেক সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছেন।
ভোটের দোরগোড়ায় এসে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, নতুন সরকার আদৌ এসব সংস্কার এগিয়ে নেবে কি না। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তারও বড় পরীক্ষা।
সূত্র: ডয়চে ভেলে
এমএস/