দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের খসড়া অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। সংশোধিত খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ”নির্বাচনী জোট হলেও প্রার্থীদের নিজ দলের প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে হবে।” আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রস্তাবটি রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বৃহৎ দল বিএনপি সহ কিছু দল এই সংশোধনীর আনার পূর্বে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সুস্পষ্ট বিরোধি অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। বেশ কিছু রাজনৈতিক দল আরপিওতে প্রতীক সংক্রান্ত নতুন নিয়ম সমর্থন করছেন। বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রস্তাব গণতন্ত্রের নীতিগত শুদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভোটারের স্বাধীন পছন্দের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রস্তাবনার পক্ষে যুক্তি:
প্রথমত, গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও দলীয় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা আছে। জোটের নামে একাধিক দল যখন এক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন ভোটার প্রায়ই বিভ্রান্ত হন কোন দল আসলে প্রার্থীটির মূল রাজনৈতিক ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করছে। নিজস্ব প্রতীক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলে প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র মতাদর্শ, সাংগঠনিক পরিচয় এবং দায়বদ্ধতা স্পষ্ট থাকবে।
দ্বিতীয়ত, এটি “জবাবদিহি” বা accountability নিশ্চিত করতে পারে। কোনো সরকার ব্যর্থ হলে সমগ্র জোট নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দলটির ওপরই মূল দায় বর্তাবে। এতে ভোটার ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। জোটবদ্ধ প্রতীকের ফলে অনেক সময় ছোট দলগুলো তাদের স্বকীয়তা হারায়, বড় দলের ছায়ায় ঢেকে যায়। নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করলে তারা নিজের জনভিত্তি গঠনের সুযোগ পাবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়— ভারত, জাপান, ইতালি কিংবা ইসরায়েলের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলেও প্রতিটি দল নিজস্ব প্রতীক ব্যবহার করে। ভারতের যুক্তফ্রন্ট বা এনডিএ (NDA) জোটে বিজেপি, জেডিইউ, শিবসেনা ইত্যাদি দল নিজেদের প্রতীকে ভোটে নামে, তবে নির্বাচনী সমঝোতায় আসন বণ্টন করে নেয়। এর ফলে ভোটার জানেন— তিনি আসলে কোন দলকে ভোট দিচ্ছেন, কোন জোটকে নয়।
প্রস্তাবনার বিপক্ষে যুক্তি:
অন্যদিকে, এই প্রস্তাবের বাস্তব প্রয়োগে কিছু বড় বাধা ও অসুবিধাও আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে ভোটারদের বড় অংশ এখনো দলীয় প্রতীককেন্দ্রিক। প্রতীকই তাদের রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোটভুক্ত দলগুলো আলাদা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হবে— যা শেষ পর্যন্ত বিরোধী শক্তির ভোটব্যাঙ্ক দুর্বল করে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জোট রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই হলো ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করা। যখন প্রতিটি দল আলাদা প্রতীকে লড়বে, তখন ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা দুর্বল হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে ব্যক্তিনির্ভরতা ও প্রতীক-ভিত্তিক আবেগ প্রবল, সেখানে যৌথ প্রতীকের অভাব জোটের ভিত নড়বড়ে করতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতাও কম নয়। নির্বাচন কমিশনকে তখন এক আসনে একাধিক জোট-ভুক্ত প্রার্থীর প্রতীক অনুমোদন দিতে হবে, যা ভোটারদের বিভ্রান্তি ও ফলাফল বিতর্কের ঝুঁকি বাড়াবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়— যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়াতে জোটগুলো কখনও যৌথ প্রার্থী দেয়, আবার কখনও “common endorsement” ব্যবস্থায় এক প্রার্থীকে পুরো জোট সমর্থন করে। এতে ভোট বিভাজন হয় না, আবার স্বচ্ছতাও বজায় থাকে। বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের মধ্যপন্থাও বিবেচনাযোগ্য হতে পারে।
গণতন্ত্রে জোট রাজনীতি অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। কিন্তু একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও ভোটারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই “নিজস্ব প্রতীক ব্যবহার বাধ্যতামূলক” প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ বাতিল বা অন্ধ সমর্থনের বিষয় নয়। বরং নির্বাচনী সংস্কারের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে এ ধরনের স্বতন্ত্র প্রতীক-ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা বজায় থাকবে, আবার প্রতিটি দল নিজস্ব পরিচয়ও রক্ষা করবে।
গণতন্ত্রে একক প্রতীক নয়, বরং মত ও পরিচয়ের বহুত্বই প্রকৃত শক্তি। সেই শক্তিকে সঠিকভাবে চর্চা করার জন্যই এ প্রস্তাবের সুফল ও সীমাবদ্ধতা— দুটিকেই প্রজ্ঞার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
লেখক:
এ কে এম মাজহারুল ইসলাম খান
লেখক, কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক