দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

র্যাবের জনবল, স্থাপনা, লজিস্টিক ও ক্ষমতা অপরিবর্তিত রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হলে জনগণ তা স্বাভাবিকভাবে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এসআরবি বিল নিয়ে আরও আলোচনা ও গভীর পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই বিল জাতীয় জীবনের অন্য সাধারণ ১০টি বিলের মতো নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিল। র্যাব প্রতিষ্ঠার পর দেশের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বাহিনীটির কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক দিক এত বেশি ছিল যে তা গোটা বিশ্বকে চিন্তিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘র্যাবের হাতে ভুক্তভোগী অনেক মানুষ রয়েছেন। আমি নিজেও ভুক্তভোগী, তবে বেঁচে আছি। কিন্তু অনেকে করুণভাবে জীবন দিয়েছেন কিংবা গুমের শিকার হয়েছেন। তারা কোথায় আছেন, তা এখনো জানা যায়নি।’
এ সময় র্যাবের হাতে গুমের শিকার হয়ে পরে ফিরে আসা সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগমের স্বামীর প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি একজন বিশিষ্ট ও মানবিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর দাবি, রাত ১২টার দিকে তাকে কক্ষ থেকে তুলে ছাদে নেওয়া হয় এবং সেখানে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে জীবিত অবস্থায় ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনা চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসব কারণেই র্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠেছিল মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও এ বিষয়ে কথা বলেছে। তবে র্যাব বিলুপ্ত করে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কারও ছিল না। এখন সরকারি পক্ষ থেকে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু প্রস্তাবই নয়, প্রায় হুবহু আগের বাহিনীকে রেখে সবকিছু অপরিবর্তিত রেখে নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সম্প্রতি পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিলটি যখন সংসদে আলোচিত হচ্ছে, তখন মাত্র পাঁচ দিন আগে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। সেখানে কোনো তল্লাশি পরোয়ানা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকজন ছুটে না এলে তাকে নিয়ে যাওয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘র্যাব সদস্যদের শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হস্তান্তর করা হচ্ছে। তাদের স্থাপনা আগের মতোই থাকবে, লজিস্টিক আগের মতোই থাকবে এবং ক্ষমতাও আগের মতোই থাকবে। তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় হলো? শুধু নাম পরিবর্তন করে একটি নতুন নাম দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
তিনি জানান, বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছেন এবং স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, বাহিনীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়, যখন লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। র্যাবের হাতে জাতীয়তাবাদী শক্তির লোকজন সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে অন্যরাও নিগৃহীত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত জাতির কোনো অংশই বাদ যায়নি বলেও মন্তব্য করেন।
এসআরবি বিল নিয়ে নাগরিক সমাজের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি সামনে আসার পর বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ থেকে আপত্তি উঠেছে। সবাই উদ্বিগ্ন। কেন এমন একটি বাহিনী প্রয়োজন, তার যথার্থতা আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, ‘জাতি অনুভব করুক যে এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বাহিনী তাদের প্রয়োজন। জাতিকে এ বিষয়ে নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গোটা জাতি এ উদ্যোগকে স্বাভাবিকভাবে নেবে না।’
আন্তর্জাতিক মহলের আপত্তি ও দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বাহিনী গঠনের মাধ্যমে সেসব আপত্তি ও দাবি পূরণ হবে না। বরং এ ধরনের বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আগের কলঙ্কিত অবস্থাতেই থেকে যাবে।
বিলটিতে ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন ও কিছু বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হলেও মৌলিক জায়গায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমার অপরাধ, আমি তদন্ত করব—এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা ও আলোচনা করে বিলটি নতুনভাবে সংসদে আনার আহ্বানও জানান ডা. শফিকুর রহমান।
এমএম/