দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় রাজনীতি ছিল তার জীবনের একেবারেই বাইরের জগত। স্বামী জিয়াউর রহমানের কর্মজীবনের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস, সংসার সামলানো আর দুই সন্তানকে বড় করে তোলাই ছিল তাঁর ব্যস্ততা। কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা পেরিয়ে তাকে নিতে হয় বৃহত্তর দায়িত্ব।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন যেন সেই গল্পই। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার গল্প। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে আসা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া, কারাবরণ, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ ১৫ আগস্ট ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক-শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী। জীবিত অবস্থায় যে জন্মদিন ঘিরে ছিল নানা আয়োজন, এবার সেই দিনটি এসেছে তাকে ছাড়াই।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন হয় স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়েছিল। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদায় জানায় দেশের মানুষ।
তবে তার রাজনৈতিক গল্পের শুরুটা ছিল অনেক দূরে—রাজনীতির বাইরে থাকা এক সংসারী নারী হিসেবে।
দিনাজপুরের পুতুল
খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উন্নতি লাভের আশায় ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে এসেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তিনি দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। গ্রেড এইটের ছাত্র ইস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে তার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে জলপাইগুড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন। যা বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন এবং একটি চা বাগানে চাকরি নেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন।
১৯৩৭ সালে তার বিয়ে হয় তৈয়বা মজুমদারের সঙ্গে। দেশভাগের পর পরিবারটি দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। সেখানে বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম চার বছর দিনাজপুরে কাটিয়েছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়া বিয়ের পর জিয়াউর রহমানের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার বাগবাড়িতেও থেকেছেন। বিয়ের পর তিনি স্বামীর কর্মক্ষেত্রের কারণে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছেন। জিয়াউর রহমানের পাকিস্তানে বদলি হওয়ায় ১৯৬৫ সালে বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর সঙ্গে সেখানে বসবাস করেন। তাদের দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও খালেদা জিয়ার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটেনি। দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারজীবনেই ব্যস্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর তার জীবনের গতিপথ আমূল বদলে যায়।
একটি রাত, একটি মৃত্যু, বদলে যাওয়া এক জীবন
স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ ছিল খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি তখন নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যেই দলটির নেতারা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানান।
১৯৮২ সালে তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। রাজনীতিতে তার অভিষেক ছিল অনেকটা অনিচ্ছাকৃত; কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপির প্রধান চালিকাশক্তি।
সেই সময় দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বিএনপিও তখন ভাঙন ও নেতৃত্ব সংকটে বিপর্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া।
রাজপথে ‘আপসহীন’ খালেদা জিয়া
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বই তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে আটক ও গৃহবন্দী করা হয়।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপির বর্জনের সিদ্ধান্ত এবং এরশাদবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ ছিলেন খালেদা জিয়া। এরপর আসে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের অধ্যায়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই জয়ী হন। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন।

তার নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
তার সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা, নারী শিক্ষা, রপ্তানিমুখী শিল্প ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি আবার সরকার গঠন করলেও প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে অল্প সময়ের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পথ তৈরি করে ক্ষমতা ছাড়ে তার সরকার।
আবার ক্ষমতায়, আবার বিরোধিতায়
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তার সরকার দেশ পরিচালনা করে। নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় সরকারটি। ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশের রাজনৈতিক সংকট নতুন মোড় নেয়।
এক-এগারো এবং কারাবন্দিত্ব
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থার মধ্যে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল। ১/১১’র সরকার বড় আঘাত হানে বিএনপির ওপর। চেষ্টা চালায় দলটিকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার।

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হন বেগম খালেদা জিয়া। একই সময়ে তার দুই সন্তানও কারাবন্দী হন। দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান তিনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিরোধী দলে যায়। খালেদা জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের দুই মাস না যেতেই রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিডিআর বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর এক কাপড়ে বেগম খালেদা জিয়াকে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ৪০ বছরের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। যে বাড়িতে জন্ম তার দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর।
সেদিন সন্ধ্যায় বেগম খালেদা জিয়া গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলেন,
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে আমাকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়েছে।
তার দীর্ঘদিনের সংসারের সব মালামাল ফেলে রেখে তাকে এক কাপড়ে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়।

২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধ আরও তীব্র হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ বড় একটি অংশের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট মনোনীত ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ভোটারবিহীন ওই নির্বাচন ছিল দেশের রাজনীতিতে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি সাজানো মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলাতেও দণ্ডিত হন তিনি। ফরমায়েশি রায় কিংবা হাসিনা সরকার রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে নানা উদ্যোগ নিলেও বেগম খালেদা জিয়া অবিচল ছিলেন। বিচার বিভাগের প্রতি বিরূপ না হয়ে বরং আস্থা রেখেছিলেন। ফলে এসব মামলায় তিনি আপিলে খালাসও পেয়েছিলেন।
কারাবন্দি অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি এবং গুলশানের বাসায় অবস্থান করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে তিনি ওই মামলাগুলো থেকে খালাস পান। তবে বিএনপিসহ অনেকের অভিযোগ, বেগম খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে অসুস্থতার মুখে ঠেলে দিয়েছে ফ্যাসিবাদি আওয়ামী সরকার।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানাও। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ এ শাসনকালে কখনো মাথানত করেননি বেগম খালেদা জিয়া। তিনি গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পান।
শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষ বছরগুলোতে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়েছেন খালেদা জিয়া। লিভার, কিডনি, হৃদ্যন্ত্রসহ নানা জটিলতায় তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আপোসহীন এই নেত্রীর।
পরদিন তার জানাজা অংশ নেয় দল-মত নির্বিশেষে দেশের লাখো জনতা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে।

চার দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক নেত্রীর জীবনের শেষ দৃশ্যটিও তাই হয়ে ওঠে জনসমুদ্রের সাক্ষী।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তার বড় ছেলে তারেক রহমানের হাতে। বিএনপির নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে। বর্তমানে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়্যারম্যান।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একটি দলের উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ সময়ের গল্প—যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসা এক গৃহবধূ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন একটি দলের প্রধান, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি এমন এক চরিত্র, যাকে বাদ দিয়ে গত চার দশকের জাতীয় রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা কঠিন।
/অ