দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

‘বাজারের ব্যাগটা হাতে নিলেই বুকটা ধড়ফড় করে। সব জিনিসের দাম ডাবল, কিন্তু আমাদের বেতনটা তো সেই ২০১৫ সালের ফ্রেমে আটকে আছে।’ কথাগুলো বলছিলেন সচিবালয়ের একজন ১১তম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল চালুর সুখবর এলেও তার চোখে-মুখে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
গত জুন মাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা আসার পর থেকেই দেশজুড়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি এখন রূপ নিয়েছে তীব্র অসন্তোষ আর হতাশায়। প্রজ্ঞাপন জারিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুই ধাপে বেতন বৃদ্ধির সরকারি পরিকল্পনা এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ফলে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে।
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের প্রত্যাশায় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আছেন অনিশ্চয়তায়। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে তাদের পেনশন ও অন্য আর্থিক সুবিধার বিষয়টি সরাসরি সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তারাও সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুতই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তবে কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়ন হবে, নতুন বেতনকাঠামোতে কোন গ্রেডে কত টাকা নির্ধারণ করা হবে এবং তা কবে থেকে কার্যকর হবে- এসব বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ধারণা না থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিশেষ করে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে পে-স্কেল নিয়ে নানা ধরনের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে। এদিকে বুধবার (১২ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সচিব কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল নিয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অনেকের ধারণা, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে পেনশন ও অন্য অবসরকালীন সুবিধাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সরকার ঠিক কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা পরিষ্কার না হওয়ায় তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
পরবর্তীসময়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে না সরকার।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে নতুন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার কথা।
সম্প্রতি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি করে সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটির প্রধান দায়িত্ব হবে জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা। প্রয়োজনে নতুন সদস্যকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ পাওয়া নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের ঋণের সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই। বেতন কাঠামো হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারি করতেও বেশি সময় লাগবে না।
কে