দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

১০৪ জনকে গুম করে হত্যার মামলায় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেওয়া তার সাক্ষ্যে র্যাব ও সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে গুম ও হত্যার ভয়াবহ সংস্কৃতির চিত্র উঠে এসেছে।
সোমবার বিচারপতি গোলাম মতুর্জা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, র্যাবে কর্মরত সেনা কর্মকর্তারা ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করত। যাদের হত্যা করা হতো, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে শরীরে ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। তিনি বলেন, তার মতে র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার। তা সম্ভব না হলে র্যাব থেকে সব সেনাসদস্যকে সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে ডিজিএফআই বিলুপ্ত করারও দাবি জানান তিনি, কারণ তার ভাষায় এই সংস্থা হত্যার মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দিয়ে টিকে থাকার নৈতিকতা হারিয়েছে।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নিহতদের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, বিভিন্ন সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন যে সে সময় র্যাব যাদের হত্যা করত, তাদেরও একইভাবে পেট চিরে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের এমন কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে সব সেনা কর্মকর্তাকে ঢাকায় এনে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শেখ মুজিব ও জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত বহু সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি হয়েছে এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু কর্মকর্তা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে আছেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, এত কিছুর পরও যখন তিনি দেখেন ক্রসফায়ার থামছে না, তখন তিনি ডিজিএফআই, বিজিবি ও র্যাব থেকে সেনা কর্মকর্তাদের পোস্টিং বন্ধ করে দেন। তখন তাকে বলা হয়েছিল, এটি বিদ্রোহের শামিল। তবে তিনি মনে করেছিলেন, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর তার ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং নিয়মিত তাকে পোস্টিং দেওয়ার জন্য ফোন আসতে থাকে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম রেডিসন হোটেল উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তাকে ডেকে র্যাবে অফিসার দিতে বলেন। তিনি তখন জনবল সংকটের কথা জানিয়ে তা সম্ভব নয় বলে জানান। অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকলেও তিনি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
তিনি আরও বলেন, র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে তার দায়িত্বকাল ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং কিছু না করতে পারার বেদনা তাকে তাড়িত করত। আজ তিনি সেই না পারা কাজগুলো বলার সুযোগ পেয়েছেন।
সাক্ষ্যে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, অনেকেই ভাবছেন তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু তার ব্যাখ্যা হলো আত্মশুদ্ধির এই সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ন হবে না, বরং আরও উঁচুতে উঠবে। জাতি জানবে, সেনাবাহিনী কখনো অপরাধীদের ছাড় দেয় না এবং সাইনবোর্ডের আড়ালে থেকে কিছু কর্মকর্তার অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি শেষ হবে। তিনি আবারও র্যাব বিলুপ্ত করা বা সেখানে থাকা সেনাসদস্যদের বাহিনীতে ফিরিয়ে আনার এবং ডিজিএফআই বিলুপ্ত করার দাবি জানান, কারণ তার মতে এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি তৈরি করে টিকে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে।
এমএস/