দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

লাস ভেগাসের ভেনেশিয়ান হোটেলের একটি বারে ঢুকে ককটেল অর্ডার করলেন একজন গ্রাহক। কাউন্টারের ওপাশে কোনো বারটেন্ডার নেই। তার বদলে দুটি রোবটিক বাহু নড়েচড়ে উঠল। কাচের গ্লাসে একে একে মিশে গেল টক-মিষ্টি উপকরণ, ঘুরল গ্লাস, হলো নানা কসরত। শেষ পর্যন্ত রোবটটি পানীয় এগিয়ে দিলো, সঙ্গে যেন নীরব এক অভিবাদনও জানাল।
পানীয়টির নাম মার্গারিটা। দাম ১৭ ডলার। কিন্তু বিলের দিকে তাকাতেই আরেকটি চমক—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ১০ শতাংশ ‘সেবা ফি’। অর্থাৎ রোবটের তৈরি পানীয়ের জন্য বকশিশও দিতে হবে।
ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। নিউইয়র্কের আর্টলি কফিতেও রোবট কফি পরিবেশনের পাশাপাশি বকশিশের অনুরোধ করত। নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি কর্মীহীন স্বয়ংক্রিয় বিক্রয়কেন্দ্রে শুধু এক বোতল পানি কেনার সময়ও বকশিশ দেওয়ার প্রস্তাব দেখা গেছে। আবার ওরেগনের পোর্টল্যান্ডের ‘টপ বার্মিজ’ রেস্তোরাঁয় অর্ডার নিয়েছেন মানুষ, কিন্তু খাবার টেবিলে পৌঁছে দিয়েছে রোবট।
মানুষের হাতে সেবা পেলে বকশিশ দেওয়া নিয়ে সাধারণত খুব বেশি প্রশ্ন থাকে না। কিন্তু রোবট সামনে এলে প্রশ্নটা বদলে যায়—বকশিশটা আসলে কার জন্য?
মানুষের জন্য, নাকি যন্ত্রের মালিক প্রতিষ্ঠানের জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর সব জায়গায় এক নয়।
‘দ্য টিপসি রোবট’ এবং আর্টলি কফির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে মানবকর্মীদের মধ্যে সব বকশিশ ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠান নিজেরা এর কোনো অংশ নেয় না। বরং গ্রাহকদের অভিযোগের পর আর্টলি কফি বকশিশের অনুরোধ দেখানোই বন্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়মটি এমন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক হলোনা ওকস মনে করেন, কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা রোবটকে দেওয়া বকশিশ নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারেন। তার সহলিখিত ‘গ্র্যাচুইটি’ বইয়ে বকশিশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ওকসের ভাষায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে লাভবান হচ্ছে এবং এর মূল্য কে দিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রে বকশিশের সংস্কৃতি এমনিতেই বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে গ্রাহকদের আরও বেশি জায়গায় বকশিশ দিতে বলা হচ্ছে। বৈদ্যুতিন অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট হারে বকশিশের প্রস্তাবও এখন খুব পরিচিত দৃশ্য। অনেক গ্রাহক এটিকে একধরনের মানসিক চাপ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বকশিশনির্ভর কর্মীদের জন্য কেন্দ্রীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ২ দশমিক ১৩ ডলার। সাধারণ কেন্দ্রীয় ন্যূনতম মজুরি সেখানে ৭ দশমিক ২৫ ডলার।
আইন অনুযায়ী, কর্মীকে দেওয়া বকশিশ থেকে প্রতিষ্ঠান, মালিক বা তত্ত্বাবধায়ক অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু বকশিশ যখন কোনো মানুষের বদলে রোবটের সামনে দেওয়া হচ্ছে, তখন আইনের জায়গাটিও যেন ধোঁয়াশায় পড়ে যাচ্ছে।
ওকস বলেন, রোবটকে দেওয়া বকশিশের মালিকানা নিয়ে এখনো কোনো আইনগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সেই অর্থ নিজেদের কাছে রাখে, সেটি শনাক্ত করা বা কর্মীদের অভিযোগ করার সুযোগও সীমিত হতে পারে।
তবে গল্পের আরেকটি দিকও আছে।
রোবট মানেই মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়া—এমনটা মনে করেন না সবাই। আর্টলি কফির পরিচালক অ্যাবিগেইল স্মাদার্সের মতে, তাদের ক্ষেত্রে রোবট মানুষের কাজের বিকল্প নয়; বরং কর্মীর ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক।
তার প্রতিষ্ঠান বলছে, রোবট ব্যবহারের উদ্দেশ্য মানুষের শ্রমের খরচ কমিয়ে দেওয়া নয়। বকশিশের বিষয়েও তারা অবস্থান স্পষ্ট করেছে—মানুষের জন্য দেওয়া বকশিশের পুরো অর্থই মানবকর্মীরা পান।
স্মাদার্সের মতে, প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়। সেটি কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই আসল বিষয়।
মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটেরিনা বেরেজিনাও মনে করেন, রোবটকে কেন্দ্র করে নেওয়া সেবা ফি বা বকশিশ সবসময় প্রতিষ্ঠানের বাড়তি মুনাফার কৌশল—এমন ধারণা ঠিক নয়। রোবট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রয়োজনীয় শ্রমের খরচ মেটাতেও এই অর্থ ব্যবহার হতে পারে।
তবে শ্রমিক অধিকার সংগঠন ‘ওয়ান ফেয়ার ওয়েজ’-এর মতো সংগঠনগুলোর অবস্থান ভিন্ন। তাদের যুক্তি, রোবট ব্যবহারের মাধ্যমে কম মজুরি দেওয়ার পুরোনো প্রবণতাকেই নতুনভাবে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তাদের মতে, সেবা খাতে কর্মী সংকটের অন্যতম কারণই হলো কম মজুরি।
আর গ্রাহকের সামনে তখন সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটি দাঁড়ায়—বকশিশ দেবেন, নাকি দেবেন না?
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ‘দ্য সাইকোলজি অব টিপিং’ বইয়ের লেখক মাইকেল লিনের মতে, মানুষ সাধারণত ভালো সেবার পুরস্কার হিসেবে বকশিশ দেন। কখনো কম মজুরি পাওয়া কর্মীকে সহায়তা করার জন্যও দেন। আবার সামাজিক চাপও কাজ করে—‘বকশিশ না দিলে তারা আমাকে খারাপ ভাববে।’
রোবটের ক্ষেত্রে এসব কারণের প্রায় কোনোটিই নেই।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী রোবট পরিবেশককে বকশিশ দিতে আগ্রহী ছিলেন। তবে যারা আগে রোবট পরিবেশকের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে বকশিশ দেওয়ার আগ্রহ ছিল বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বকশিশের অর্থ মানবকর্মীদের দেওয়া হবে জানানো হলে প্রায় ৪২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তাদের মত বদলে ফেলেন।
অর্থাৎ মানুষ রোবটকে নয়, মানুষকেই বকশিশ দিতে আগ্রহী।
এদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও জানে, গ্রাহক একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেটিই নতুন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হতে পারে।
তবে লিনের ধারণা, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা গ্রাহকের হাতেই থাকবে। রোবটকে বকশিশ দেওয়া যদি গ্রাহকদের বিরক্ত করে, যদি তারা এমন প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কমিয়ে দেন, তাহলে ব্যবসাগুলোও একসময় এই ব্যবস্থা বাদ দিতে বাধ্য হতে পারে। আর নিয়ম তৈরি হয় মানুষের আচরণ থেকেই।
আজ তাই রোবট শুধু ককটেল বানাচ্ছে না, কফি দিচ্ছে, খাবার পৌঁছে দিচ্ছে—তার সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে একটি ডিজিটাল হাতও।
সেই হাতে টাকা রাখবেন কি না, সেটি আপাতত গ্রাহকের সিদ্ধান্ত।
/অ