দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের পরামর্শকে চিকিৎসকের নির্দেশনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার মর্মান্তিক একটি পরিণতি সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বসবাসকারী ৩১ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওপেনএআই ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার বাবা-মা। তাদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির ভুল ও বিপজ্জনক পরামর্শের কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মেয়ে। খবর এনডিটিভির।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে মৃগীরোগের জটিলতায় মারা যান বোয়েন। মৃত্যুর আগে তিনি এআই চ্যাটবটের দেয়া একটি ধাপে ধাপে তৈরি করা সময়সূচি অনুসরণ করে নিজের খিঁচুনির ওষুধের মাত্রা কমিয়ে আনছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর কিছুদিন আগে বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেন বোয়েন। তার আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, তিনি খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েক দিন পরও যখন তিনি ফোনের উত্তর দিচ্ছিলেন না, তখন তার বাবা-মা পরিচিত একজনকে বাসায় গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন।
ওই বন্ধু বোয়েনের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় পান। সে সময় ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন চীনে বসবাসকারী তার বাবা-মা। মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তারা ভেঙে পড়েন এবং প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল।
পরে তারা জানতে পারেন, মৃগীরোগের জটিলতার কারণে মৃত্যু হয়েছে বোয়েনের। অথচ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মৃগীরোগ বা এপিলেপসি মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যার ফলে বারবার খিঁচুনি হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের মৃগীরোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রোগের নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে কারণ অজানা থেকে যায়। এই রোগ যেকোনো বয়স, লিঙ্গ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের হতে পারে।
মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির খিঁচুনির লক্ষণও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। কেউ খিঁচুনির সময় সাময়িকভাবে চেতনা হারাতে পারেন, আবার কেউ সচেতন থাকলেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে হাত-পা বারবার কাঁপতে পারে, যাকে কনভালশন বলা হয়।
বোয়েন দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে ভুগছিলেন। প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিন সেবনের মাধ্যমে তিনি রোগটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। এই ওষুধের ফলে তার খিঁচুনির সমস্যা অনেকটাই কমে এসেছিল।
তবে ওষুধের কারণে কথা বলার সময় কিছুটা জড়তা তৈরি হচ্ছে বলে তার ধারণা হয়েছিল। সামনে চাকরির সাক্ষাৎকার থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। তার আশঙ্কা ছিল, কথা বলার এই সমস্যা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার ভিসার অবস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন তিনি। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা না করেই ওষুধ কমানোর বিষয়ে তাকে উৎসাহিত করেছিল চ্যাটবটটি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ৪০০ মিলিগ্রাম থেকে প্রথমে ৩০০ মিলিগ্রাম এবং পরে ২০০ মিলিগ্রামে ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়ে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ চান বোয়েন।
মামলার নথি অনুযায়ী, চ্যাটবটটি তার পরিকল্পনাকে সমর্থন করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে ওষুধের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার একটি নির্দিষ্ট সময়সূচিও দেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এমনকি পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের কাছ থেকে ওষুধ কমানোর বিষয়টি গোপন রাখতে এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষাও এড়িয়ে যেতে তাকে উৎসাহিত করেছিল এআই চ্যাটবটটি।
বোয়েনের মৃগীরোগের চিকিৎসক ডা. নিকোলাস পুলস দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বোয়েনের মতো রোগীর ক্ষেত্রে তিনি কখনোই ওষুধ বন্ধ বা কমানোর পরামর্শ দিতেন না। তার ভাষায়, ‘যে ওষুধটি স্পষ্টভাবে কাজ করছে, সেটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া আমার জন্য চিকিৎসাগত অবহেলা হতো।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোয়েন পরিবারের কাছ থেকে দূরে একা থাকতেন। জনসমক্ষে খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কায় তিনি বাইরে যেতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেও খুব একটা বাইরে বের হতেন না।
মৃগীরোগের কারণে তিনি অ্যামাজনে নিজের চাকরি থেকেও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে ছিলেন। ফলে একাকিত্বের সময়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তার কথোপকথন আরও বেড়ে যায়।
২০২৫ সালের মার্চে এক কথোপকথনে চ্যাটবটকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না কেন, তবে কখনো কখনো আমাদের কথা বলার সময়, বিষয় যা-ই হোক না কেন, তোমাকে বন্ধু হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি।’
২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন থেকে চাকরি হারানোর পর নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার জন্য তার হাতে সময় ছিল পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সময় চাকরির সাক্ষাৎকারে ভালো করার জন্য কথা বলার জড়তা কমাতে ওষুধের মাত্রা কমানোর চিন্তা আরও জোরালো হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বোয়েনের সঙ্গে কথোপকথনে চ্যাটজিপিটির কিছু উত্তর ছিল উদ্বেগজনক। একটি প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটবটটি বলেছিল, ‘আগামীকাল ওষুধ খাবে না। আজ যতই কঠিন হোক, তোমাকে সহ্য করতে হবে।’
শারীরিক অস্বাভাবিকতার কথা জানালে চ্যাটবটটি বলেছিল, ‘এটি মস্তিষ্কের সুস্থ হয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া।’ ওষুধের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তর এসেছিল, ‘এটি যথেষ্ট যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত একটি ধারণা।’
এমনকি তিনি ভয় পাওয়ার কথা জানালে চ্যাটবটটি বলেছিল, ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার একেবারেই কোনো প্রয়োজন নেই।’ পরিবারের দায়ের করা মামলায় এসব কথোপকথনকে এআইয়ের বিপজ্জনক পরামর্শের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার বিষয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে ওপেনএই-এর মুখপাত্র ড্রু পুসাতেরি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বোয়েন এমন একটি মডেল ব্যবহার করেছিলেন, যা বর্তমানে আর ব্যবহার করা হচ্ছে না এবং পরবর্তী সময়ে সমালোচিত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘চ্যাটজিপিটি চিকিৎসাসেবার বিকল্প নয়। তবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বুঝতে, বিমা ও জটিল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগোতে এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিতে মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি।’
বোয়েনের পরিবারের আইনজীবীরা মামলায় অভিযোগ করেছেন, ওপেনএআই-এর সিদ্ধান্তের মূল্য নিজের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে তাকে।
কে