দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনে আবারও যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের দেশ হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনে ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাতের মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রায় আট বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। ওই যুদ্ধে কয়েক দশক হাজার মানুষ নিহত হন। তবে চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। সোমবার তাইজ, আল-বাইদা ও আল-জাওফ প্রদেশে লড়াই আরও তীব্র হয়। আল-জাওফকে হুথি নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে হুথিরা দাবি করেছে, তারা সরকারি বাহিনীর কয়েকটি অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেন সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি আরবেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত যুদ্ধ আবারও জ্বলে ওঠার পেছনে পুরো অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
জুলাইয়ে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। ইয়েমেন সরকারের দাবি, হুথি নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর ইরান থেকে আসা একটি বিমান সেখানে অবতরণ করতে পারেনি। এরপর আরও কয়েক দফা হামলা হয়। গত সপ্তাহে হুথিরা পশ্চিম তাইজ ও দক্ষিণ হোদেইদাহ হয়ে বন্দরনগরী আল-মাখা বা মোখা এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের এই নতুন পর্যায়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ইরান-সমর্থিত হুথিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়েছে।
একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া উভয় পক্ষ। ইরানের কার্যত হরমুজ প্রণালির চলাচল সীমিত করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরের এই জলপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে হুথিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন সরকারের পক্ষে থাকা বাহিনীগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সম্পদ ও অস্ত্রের সুবিধা পাচ্ছে। তবে এতে দ্রুত বিজয় আসবে—এমনটা মনে করছেন না তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা ও ইয়েমেনি-মার্কিন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা আল জাজিরাকে বলেন, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ ও নেতৃত্বের বিভক্তির পর ইয়েমেন সরকার এখন পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে চাইছে।
চলতি বছরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছ থেকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা দক্ষিণ ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকা পুনর্দখল করতে সক্ষম হয় সরকার। এতে উৎসাহিত হয়ে এবার হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক মাহজুব জুয়েরি বলেন, ইয়েমেন সরকার এখন তুলনামূলক বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মাঠে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংখ্যাও কমেছে। ফলে সানা ও এর আশপাশে হুথিরাই এখন প্রধান প্রতিপক্ষ।
সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের পরাজয়ের পর সরকারবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীকে একক সামরিক কমান্ডের অধীনে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে ইয়েমেন সরকার। তবে আল-বাশার মতে, হুথিরা এখনো একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবে না।
হুথিদের পিছু হটতে বাধ্য করা গেলে তারা সাদা, হাজ্জাহ, সানা ও আশপাশের উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় অবস্থান শক্ত করতে পারে বলেও মনে করছেন তিনি। এতে হুথি নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চল এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে আরও স্পষ্ট ভৌগোলিক বিভাজন তৈরি হতে পারে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও তার মিত্রদের হামলার মধ্যেই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জুয়েরি বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে মিলিশিয়াসহ রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবসান ঘটানোর বিষয়ে একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাবও বাড়ছে। এর প্রভাব ইয়েমেনের পরিস্থিতিতেও পড়ছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনে ইয়েমেন সরকার কার্যত সবুজ সংকেত পেয়েছে।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফির মতে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্ব বদলে দিয়েছে। হুথিরা এখন শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের অংশ নয়; লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ও ইচ্ছা তারা দেখিয়েছে।
সৌদি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক হুথি হামলা, যাতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন বাতারফি। তাঁর মতে, এসব হামলা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আবার সরাসরি সৌদি-হুথি নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করতে পারে।
তবে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতের অবসান বা উত্তেজনা কমে এলেও সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার সংঘাত শেষ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করেন আল-বাশা। কারণ ইয়েমেনের নিজস্ব অমীমাংসিত যুদ্ধ, ভূখণ্ডগত বিরোধ ও রাজনৈতিক দাবি রয়েছে।
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সরাসরি উত্তেজনা এড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা থাকলেও ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, যার মধ্যে হুথিরাও রয়েছে, সৌদি আরবের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে বলে মনে করেন আল-বাশা।
স্থলভাগে চাপের মুখে থাকলেও হুথিরা সমন্বিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে সৌদি আরবকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সৌদি আরব এতদিন ইয়েমেনে আবার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। তবে দেশটির বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা সেই হিসাব বদলে দিচ্ছে বলে মনে করেন বাতারফি। কোনো রাষ্ট্রই অনির্দিষ্টকাল নিজের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা সহ্য করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় হুথিদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ, পরিশোধিত জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য হুথিদের কাছে পাঠানো অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করেন আল-বাশা।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
জুয়েরির মতে, হুথিদের মাধ্যমে ইরান এই প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা।
এই কারণেই হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানে সৌদি আরবের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। হুথিরা এর আগে এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে নৌবাণিজ্যের জন্য বাব আল-মান্দাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করার পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তবে হুথিরাও গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় নৌপথের দিকে অগ্রসর হতে চাইছে। আল-বাশার মতে, লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং আরব সাগরের কিছু অংশে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলার মতো সক্ষমতা হুথিদের রয়েছে।
ভবিষ্যতে তারা জলপথ ব্যবহারের ওপর কর বা মাশুল আরোপেরও চেষ্টা করতে পারে। বাতারফির সতর্কতা, একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে এর প্রভাব ইয়েমেন বা সৌদি আরবের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য নিরাপত্তার বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, ইয়েমেন সরকার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তারা বর্তমান লড়াইকে হুথিদের কাছ থেকে আরও ভূখণ্ড দখল এবং নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এবারই প্রথম সরকার একাধিক ফ্রন্টে হুথিদের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান চালাচ্ছে এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেছে বলেও জানান তিনি। আগের তুলনায় সরকারি বাহিনীর সমন্বয়ও ভালো এবং তাদের হাতে উন্নত অস্ত্র রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেউ কেউ শুরুতে সিরিয়ার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা করেছিলেন, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্রুতগতির অভিযানে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছিল।
কিন্তু আল-বাশার মতে, ইয়েমেনে পরিস্থিতি বরং সুদানের মতো হতে পারে—যেখানে দুটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ভৌগোলিক শক্তি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/