দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সূত্রপাত হয়েছিল হিমালয়ের ৫ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায়। সেখানে ঘটে যাওয়া একটি ভূকম্পনসদৃশ ঘটনা থেকে শুরু হয় ঘটনাপ্রবাহ। তবে ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় শুরু হয়েছিল—ভূমিকম্পে হিমবাহ ধসে পড়েছিল, নাকি হিমবাহের পতন থেকেই ভূমিকম্পের মতো কম্পন তৈরি হয়েছিল—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল সময় ওই এলাকায় একটি কম্পন রেকর্ড হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক প্রথমে সেটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করে। তবে পরে এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা পরে তাদের ব্যাখ্যা সংশোধন করে জানায়, নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানে হিমবাহসম্পৃক্ত ভূমিধস থেকে ওই ভূকম্পনসদৃশ তরঙ্গ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাদের হিসাবে, ওই ভূমিধসের শক্তি ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।
অন্যদিকে ভারতের দূর অনুধাবন কেন্দ্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়, ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হিমবাহ ধসের সূত্রপাত ঘটায় এবং ঘটনাপ্রবাহের শুরু হয়েছিল তিব্বতের দিক থেকে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রও জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত সূত্র এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে এরপর কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে ঘটনাপ্রবাহের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। উপগ্রহচিত্রের ভিত্তিতে করা ভূতাত্ত্বিক পুনর্গঠনে দেখা যায়, পাহাড়ের একটি অংশের সঙ্গে হিমবাহ নেপালের দিকে ধসে পড়ে। সেই ধ্বংসাবশেষ তিব্বতের দিকে একটি নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে জমে থাকা পানি প্রবল স্রোতে সেই বাধা ভেঙে কাছের সীমান্তবন্দরে আঘাত হানে। এরপর ধ্বংসের ঢল প্রবেশ করে নেপালে।
লেন্দে খোলা, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ধরে কাদা, পাথর, বরফ ও পানির বিশাল স্রোত প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। নেপালের জলবিদ্যা বিভাগ জানিয়েছে, মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা ৯ মিটার বেড়ে যায়।
ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম বড় আঘাত আসে চীনের সীমান্তবর্তী গিরং বন্দরে। ভূমিধসের স্থান থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরের এই বন্দরটি হিন্দু তীর্থযাত্রীদের কৈলাস মানসসরোবর যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথ। পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে বন্দরটির ভবন প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঘটনাস্থলের ক্যামেরায় ভবনটি প্রবল কাদার স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়ে।
চীন থেকে নেপালে প্রবেশের পর ধ্বংসের স্রোত ভোতে কোশি নদী ধরে ত্রিশূলীতে গিয়ে মেশে। এরপর রাশুয়া জেলার তিমুরে ও সিয়াপ্রু বেসি এলাকায় আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মানচিত্রে ধ্বংসের মূল স্রোতের প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথের ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ স্রোতটি ঘণ্টায় গড়ে ১৯৩ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলের ১০টির বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। এতে নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১২ শতাংশের বেশি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
এরপর ধাদিং পেরিয়ে ত্রিশূলী নদী পাহাড়ি গিরিখাত ছেড়ে দেবঘাটে কালীগণ্ডকীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে নদীটির নাম হয় নারায়ণী। পরে ত্রিবেণী দিয়ে এটি ভারতে প্রবেশ করে এবং বিহারের গণ্ডক ব্যারাজে পৌঁছায়।
২৬ আগস্ট দুপুরে বিহারের জলসম্পদ বিভাগ গণ্ডক ব্যারাজে প্রতি সেকেন্ডে ৮৬ হাজার ঘনফুট পানি প্রবাহ রেকর্ড করে। পানি বাড়তে থাকায় ব্যারাজের সব ৩৬টি গেট খুলে দেওয়া হয়। ওই রাতেই পানিপ্রবাহ সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার ঘনফুটে পৌঁছায়। বৃহস্পতিবার সকালে তা কমে ১ লাখ ৪ হাজার ঘনফুটে নেমে আসে।
বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও জলসম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশও মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগর জেলাকে সতর্ক করে। ওই দুই জেলার নদী থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যেগুলো নেপাল থেকে ভেসে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নেপালের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তের কাছে আরেকটি ভূমিধসের কারণে অথবা আগের ভূমিধসের অবশিষ্টাংশ থেকে নতুন একটি বাধহ্রদ তৈরি হয়েছে। সেটি ইতোমধ্যে উপচে পড়ছে এবং যেকোনো সময় ভেঙে ভয়াবহ ঢল নামার উচ্চঝুঁকি রয়েছে।
/অ