দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান এবং দেশটির শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইমরান খানের সম্ভাব্য মুক্তি ও চিকিৎসার বিষয়টি ঘিরে দুই পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনাপ্রধান ও ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ইমরান খানের কারামুক্তি কিংবা তাকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের মতো যেকোনো ব্যবস্থা শুধু সুপ্রিম কোর্টের আদেশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে না; এ বিষয়ে সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতাও প্রয়োজন হতে পারে।
এর ফলে ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকেই দেশটির বিভিন্ন সেনাপ্রধান ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তার সম্পর্ক বারবার টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে।
ইমরান খানের সঙ্গে সামরিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তিন জেনারেলকে ঘিরে—সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া, সাবেক আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফায়েজ হামিদ এবং বর্তমান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ইমরান খান ফায়েজ হামিদকে আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই)-এর মহাপরিচালক নিয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে হামিদের সঙ্গে ইমরানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সে সময় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে তিনি তুলনামূলকভাবে জুনিয়র হলেও বাজওয়ার অবসরের পর সেনাপ্রধান হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছিল।
পরে জেনারেল বাজওয়াকে আরও তিন বছরের জন্য দায়িত্বে রাখা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, এই মেয়াদে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা অবসরে গেলে ফায়েজ হামিদের সেনাপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তবে ইমরান খান, বাজওয়া ও হামিদের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। বাজওয়া শেষ পর্যন্ত আইএসআইয়ের নেতৃত্বে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেন। ফায়েজ হামিদকে আইএসআই প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে পেশোয়ারের কর্পস কমান্ডার করা হয় এবং তার স্থলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম আহমেদ আনজুমকে আইএসআই প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, আসিম মুনিরের সঙ্গেও ইমরান খানের সম্পর্ক আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ২০১৮ সালে বাজওয়ার অধীনে মুনির আইএসআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রায় আট মাসের মাথায় তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ইমরান খান তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগের বিষয়ে মুনিরের ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ইমরান খানের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং পরবর্তীতে শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হন।
২০২২ সালের শেষ দিকে আসিম মুনির সেনাপ্রধান নিযুক্ত হলে ফায়েজ হামিদের সেনাপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়। পরে হামিদ সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন এবং বিভিন্ন অভিযোগের মামলায় সামরিক আদালতে বিচার শেষে ১৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
ইমরান খানকে ঘিরে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন পাকিস্তান একাধিক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশটির বর্তমান চার প্রদেশকে পুনর্গঠন করে ৩৩টি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করার একটি প্রস্তাব। বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ভেতরেও আপত্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবটির সমর্থকদের যুক্তি, ছোট প্রশাসনিক ইউনিট তৈরি হলে শাসনব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং ইসলামাবাদ থেকে বরাদ্দ করা উন্নয়ন তহবিল স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তবে এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক সংসদীয় সমর্থন এবং সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। পিএমএল-এন, পিপিপি ও পিটিআইয়ের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছাড়া এমন সাংবিধানিক উদ্যোগ সংসদে পাস করা কঠিন হবে।
এ নিয়ে সামরিক নেতৃত্ব ও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার টানাপোড়েনও প্রকাশ্যে আসছে। সামরিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পিটিআইয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার জন্য রাজনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা চলছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে পিটিআইয়ের প্রধান দাবি এখনো ইমরান খানের মুক্তি।
ইমরান খানের কারাবাস ও চিকিৎসার বিষয়টি এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ইমরান খানের পক্ষের দাবি, তাকে হয় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি দিতে হবে, অথবা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু তাকে বেসরকারি শাফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) চিকিৎসা পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এদিকে পিটিআই-নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখোয়া সরকারের পক্ষ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য লং মার্চের ঘোষণা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অন্যদিকে জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলগুলো ইমরান খানের কারাবাস, চিকিৎসা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার অভিযোগে বৃহত্তর সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজলের (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানও পিটিআইসহ অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
পিপিপি যদি বৃহত্তর বিরোধী জোটে যোগ দেয়, তাহলে ইসলামাবাদের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল শাহবাজ শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে ২০২২ সালে ইমরান খানের সরকার পতনের মতো পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে।
এমএস/