দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় বিশ্বের অধিকাংশ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের গায়ে প্রায় অবধারিতভাবেই লেখা থাকত—‘মেড ইন চায়না’ বা ‘অ্যাসেম্বলড ইন চায়না’। তবে সেই চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চীন এখনও বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের প্রধান শক্তি হলেও, কোম্পানিগুলো একক দেশনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হয়ে উঠেছে ভারত।
গত দেড় দশকে চীন বিশ্বের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য গ্যাজেট উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। উন্নত অবকাঠামো, বন্দর, বিদ্যুৎব্যবস্থা, দক্ষ শ্রমশক্তি ও বিশাল সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের কারণে কম সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে চীনের বিকল্প তৈরি হয়নি। একসময় বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি স্মার্টফোন চীনের কারখানায় উৎপাদিত হতো।
কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি, বন্দর ও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং চিপ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিয়ে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরপরই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল। অর্থাৎ, চীনে উৎপাদন চালু রাখার পাশাপাশি অন্তত একটি বিকল্প দেশে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা। তবে বাস্তবে এই ‘প্লাস ওয়ান’ এখন আর একটি দেশ নয়; বরং ভারত, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশের সমন্বয়ে নতুন বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালের হিসাবে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম মিলে বিশ্বের মোট স্মার্টফোন উৎপাদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করেছে। চীন প্রায় ৬৩ শতাংশ উৎপাদন নিয়ে এখনও শীর্ষে। তবে ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ বৈশ্বিক স্মার্টফোন উৎপাদনের অংশীদার হয়েছে এবং এই হার আরও বাড়ছে।
অ্যাপলের আইফোন উৎপাদন এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। কয়েক বছর আগেও ভারতে আইফোন উৎপাদনের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আইফোন ভারতে সংযোজিত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা স্মার্টফোনের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবেও ভারত চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন আমদানিতে ভারতের অংশ ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ হয়েছে।
গুগলও তাদের পিক্সেল স্মার্টফোনের উৎপাদন ভিয়েতনাম থেকে সরিয়ে ভারতে বাড়াচ্ছে। কোম্পানিটি ২০২৭ সালের মধ্যে ফোন, স্মার্টওয়াচ ও ইয়ারবাড উৎপাদনে চীনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। মাইক্রোসফট, অ্যামাজনসহ অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও সার্ভার, ল্যাপটপ ও নেটওয়ার্কিং সরঞ্জামের উৎপাদন কোথায় করা হবে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
তবে এর অর্থ চীনের ভূমিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন এখনও চীনেই উৎপাদিত হয়। ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, ডিসপ্লে প্যানেল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদনেও চীনের বিশাল সক্ষমতা রয়েছে। পরিবর্তনটি মূলত চীনকে বাদ দেওয়া নয়; বরং চীনের পাশাপাশি আরও শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্র তৈরি করা।
এক দশক আগেও ভারতকে বড় ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে খুব কম মানুষই দেখতেন। দেশটির পরিচিতি ছিল মূলত তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও কল সেন্টারভিত্তিক সেবায়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দরজট ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শিল্প বিনিয়োগের পথে বাধা ছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। এক দশক আগে ভারতে বিক্রি হওয়া মোবাইল ফোনের মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশে উৎপাদিত হতো। এখন প্রায় সব মোবাইল ফোনই দেশেই তৈরি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশটির মোবাইল ফোন উৎপাদনের মূল্য ২০ গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং রপ্তানি বেড়েছে শতগুণের বেশি। ফলে ভারত মোবাইল ফোনের নিট আমদানিকারক থেকে নিট রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে স্মার্টফোন ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যা দেশটির ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম এবং রত্ন ও গয়নার মতো খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে ভারতের সরকারের শিল্পনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’ বা পিএলআই কর্মসূচির আওতায় উৎপাদন ও বিক্রির নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ভারতে কারখানা স্থাপনে আরও আগ্রহী হয়েছে।
ভারতের লক্ষ্য এখন শুধু বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে ফোন তৈরি করা নয়। দেশটি সার্কিট বোর্ড, ক্যামেরা মডিউল, ব্যাটারি, ডিসপ্লে এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও দেশে উৎপাদন করতে চায়।
এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, যদিও তা এখনও সীমিত। ভারতে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন বর্তমানে প্রায় ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ফোনের মোট মূল্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশে তৈরি হলেও বড় অংশের উপাদান এখনও বিদেশ থেকে আসে।
সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর খাতে। ‘সেমিকন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় ভারত প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। নতুন সিলিকন ও ডিসপ্লে ফ্যাব এবং উন্নত প্যাকেজিং স্থাপনার ব্যয়ের বড় অংশে সরকারি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে চিপ ডিজাইন, উৎপাদন সরঞ্জাম, বিশেষায়িত উপকরণ এবং দক্ষ প্রকৌশলী তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ১২০ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইন তৈরি করা। বিশেষ করে উন্নত চিপ প্যাকেজিং এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি ও পাওয়ার ইলেকট্রনিকসে ব্যবহৃত ওয়াইড-ব্যান্ডগ্যাপ সেমিকন্ডাক্টরের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের এই উত্থানকে নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উৎপাদন খাতে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা একটি বড় বিষয়। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বা সরকারি ব্যয় নীতিতে পরিবর্তন এলে এসব সুবিধা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবহন ও বন্দর অবকাঠামো, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়েফার প্রক্রিয়াকরণ ও অত্যাধুনিক উৎপাদন সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের মতো ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরিতেও সময় লাগবে।
ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোও ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের বড় সুবিধাভোগী হয়েছে। বড় বাজারগুলোর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির তুলনামূলক সীমাবদ্ধতাও রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধা তৈরি করছে।
অন্যদিকে, ভারতের ২৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের হার দেখিয়ে দেয় যে দেশটির ইলেকট্রনিকস শিল্প এখনও পূর্ব এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যন্ত্রাংশ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ভারতীয় কারখানাগুলোও তার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে না।
ভারত চীনকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে—এমন নয়। বরং স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত প্রযুক্তিপণ্য কীভাবে তৈরি, সরবরাহ ও নিরাপদ রাখা হবে, সেই নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হয়ে উঠছে দেশটি।
আগামী দিনের বড় প্রশ্ন তাই ভারত চীনের জায়গা নিতে পারবে কি না, সেটি নয়। বরং বিশ্ব ভারতকে শুধু কম খরচে পণ্য তৈরির আরেকটি কারখানা হিসেবে দেখবে, নাকি প্রযুক্তির নকশা, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার প্রকৃত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে—তার ওপরই নির্ভর করবে বৈশ্বিক প্রযুক্তি অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের বড় অংশ।
এমএস/