দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নেপালের উত্তর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের তিন দিন পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বুধবার সকালে চীন সীমান্তের কাছে রাসুয়া জেলার ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। প্রবল স্রোতের সঙ্গে পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ছুটে গিয়ে রাস্তা, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভেসে যায় মানুষ, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা।
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রাসুয়ায় নিহতদের পাশাপাশি ভাটির বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহও রয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৯৭৭ জন, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি।
ভোতেকোশি নদী ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার অংশ হওয়ায় বন্যার স্রোত মানুষ ও ধ্বংসাবশেষ বহুদূর ভাটিতে নিয়ে গেছে। ফলে রাসুয়ায় শুরু হওয়া উদ্ধার অভিযান এখন নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
ভাটির বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিতওয়ানে সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সেখানে ১৮৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে ভারতপুরে শিল্প উদ্যোগ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ভবনটি সংস্কার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করছে ভারতপুর মহানগর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো শুকনো বরফ সরবরাহের ব্যবস্থা করছে।
প্রয়োজনে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানও ব্যবহার করা হতে পারে।
নাওয়ালপরাসি পূর্ব জেলাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জায়গা না থাকায় মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে। কাভাসোতিতে একটি কমিউনিটি বন হলকেও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তানাহুন, গোরখা, নাওয়ালপরাসি পূর্ব ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ পোখারায় নেওয়া হয়েছে। কাস্কি জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে মোট ৮৮টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকায় সেখানেও ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মরদেহগুলো ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এই তাপমাত্রায় সাধারণত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর বেশি সময় সংরক্ষণের জন্য শূন্য ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা প্রয়োজন হবে। তবে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণের মতো এমন সুবিধা পোখারায় বর্তমানে নেই।
বন্যায় নিহতদের শনাক্ত করা এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ মরদেহের ছবি তুলছে, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করছে, ময়নাতদন্ত করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা নিচ্ছে। মুখমণ্ডল শনাক্ত করা সম্ভব হলে ছবি দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুতে নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে।
কিছু মরদেহ শেষ পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিচয়হীন মরদেহ অনির্দিষ্টকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের মরদেহের জন্য নিরাপদ স্থানে দাফনের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় সরকারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
প্রতিটি মরদেহে একটি নম্বরযুক্ত ট্যাগ লাগানো হবে এবং দাফনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ বা অন্য কোনো প্রমাণের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হলে ওই তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহের অবস্থান খুঁজে বের করার সুযোগ থাকবে।
নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে পরিবারের সদস্যরা ভাটির বিভিন্ন জেলায় যেতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে চিতওয়ানে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়ায় সেখানে ছুটে যাচ্ছেন নিখোঁজদের স্বজনেরা।
অনেকে নিখোঁজ স্বজনের ছবি সঙ্গে নিয়ে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের আশপাশে অপেক্ষা করছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে স্বজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় রয়েছেন তারা।
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৯৭৭ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। নেপাল পুলিশের ২৮ সদস্যও দুর্যোগের সময় থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের তালিকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটক, পর্বতারোহী ও বিভিন্ন কাজে ভ্রমণকারীরাও রয়েছেন। তবে তালিকায় থাকা কেউ নিরাপদে পৌঁছেছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বন্যাকবলিত রাসুয়া থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন মার্কিন ও ২ জন ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন। আরও তিনজনের জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে।
বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নদীতীর ও জনবসতিতে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নুওয়াকোট, রাসুয়া ও ধাদিংয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ১ হাজার ৪৭৩ জনকে উদ্ধার অথবা প্রাথমিক সহায়তা দিয়েছে। উদ্ধার অভিযানে ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও এতে অংশ নিচ্ছেন।
বন্যায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক জায়গায় হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
চীনের ভূখণ্ডে নতুন করে পানির ঢল আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলের কাছে একটি বড় জলাধারসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার সকালে এর পানির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার বলে জানিয়েছে। পরবর্তী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হ্রদটি ভেঙে যাওয়ার তথ্য পায়। তবে নেপাল সরকার বড় কোনো হ্রদ বা বাঁধ ধসে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
নেপাল সরকারের মুখপাত্র ও শিক্ষামন্ত্রী সাসমিত পোখরেল জানিয়েছেন, হিমবাহ ভেঙে পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোনো বাঁধ ধসে পড়ার তথ্য নেই এবং চীন জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের হুমকি নেই।
চীন ও নেপালের পাওয়া তথ্যের মধ্যে এখনো পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি।
চোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে পরে একত্রিত হয়ে নেপালে প্রবেশ করেছে। নেপালে এই নদী ভোতেকোশি নামে পরিচিত। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোতেকোশি নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে।
নতুন করে পানির ঢল এলে তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ধুনচেসহ রাসুয়ার বিভিন্ন এলাকায় থাকা হেলিকপ্টারগুলো নদী ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নেপালের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রী এক মাসের বেতন ও সম্মানী প্রধানমন্ত্রীর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেবেন।
এ ছাড়া নেপাল-চীন সীমান্ত, ভোতেকোশি নদী ও ভাটির এলাকাগুলোর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।
ভারতও অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ভারতের তৃতীয় সামরিক বিমান নেপালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে দুটি চালানে ৪৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বন্যায় ৯০ জন মার্কিন নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিখোঁজ থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে এবং একটি দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
বন্যার তৃতীয় দিনেও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে জীবিতদের উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান। তবে পরিস্থিতি এখন শুধু উদ্ধার অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ, স্বজনদের সহায়তা এবং বিভিন্ন জেলায় অস্থায়ী মর্গ পরিচালনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা ও সেতুর কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ভোতেকোশি নদীর পানির উচ্চতাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চীনের দিকে তৈরি হওয়া জলাধারসদৃশ হ্রদ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে কতটা পানি নেপালে প্রবেশ করেছে বা করতে পারে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এ অবস্থায় ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বন্যার তিন দিন পরও দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়নি। মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫৩৮ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ। উদ্ধার অভিযান এবং নিখোঁজদের সন্ধান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
এমএস/