দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নতুন করে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। স্থানীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল ও প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ।
বুধবার পাহাড়ি নদীতে বরফ, কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া কয়েক ডজন মরদেহ সমতল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।

নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুধান গুরুং বলেছেন, এখন উদ্ধার অভিযানের মূল লক্ষ্য জীবিতদের খুঁজে বের করা। দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শহর ও উপত্যকায় জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশূলী এলাকার নিখোঁজদের মধ্যে ১০০ ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান পেয়েছে উদ্ধারকারীরা। তাদের বেশির ভাগই তীর্থযাত্রী। এ ছাড়া ২৫ জন চীনা শ্রমিককেও খুঁজে পাওয়া গেছে।
তবে এখনো ৬৫০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় কত মানুষ নিখোঁজ, সে সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি নেপালের কর্তৃপক্ষ।
রেড ক্রস জানিয়েছে, বন্যায় পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু অচল হয়ে পড়ায় অনেক জনপদ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দুর্যোগের পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীন জানিয়েছে, তাদের অংশে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে বুধবারের বন্যার ঘটনাস্থলে নদীর গতিপথে বাধা তৈরি হয়ে একটি হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, হ্রদটির পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং এটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হ্রদটি ভেঙে গেলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।ৎে
সর্বশেষ এই দুর্যোগের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিমবাহজনিত কয়েকটি বিপর্যয়।
১৯৪১: হুয়ারাজ, পেরু
উত্তর পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় হিমবাহ হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে হুয়ারাজ শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আনুমানিক ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ইতিহাসে এটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর একটি।
১৯৬২: রানরাহিরকা, পেরু
পেরুর সর্বোচ্চ পর্বত হুয়াসকারান থেকে বিশাল একটি বরফখণ্ড ভেঙে পড়ে। মাত্র সাত মিনিটে প্রায় এক কোটি ঘনমিটার শিলা, বরফ ও তুষার পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসে।
রানরাহিরকা গ্রাম ও আশপাশের কয়েকটি বসতি প্রায় ১২ মিটার পুরু কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে। এতে আনুমানিক ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
১৯৭০: ইউঙ্গাই, পেরু
রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে হুয়াসকারান পর্বতের উত্তর দিকের অংশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এরপর হিমবাহের বরফ ও শিলার বিশাল স্তূপ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৩৫ কিলোমিটার গতিতে ইউঙ্গাই ও রানরাহিরকার দিকে নেমে আসে।
এ ঘটনায় আনুমানিক ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই ভূমিকম্পে মোট মৃতের সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের বেশি। ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিমবাহজনিত দুর্যোগ।
১৯৮১: সিরেনমা কো, তিব্বত
চীন-নেপাল সীমান্ত থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সিরেনমা কো নামের একটি হিমবাহ হ্রদে ওপর থেকে ঝুলে থাকা বরফের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এর আঘাতে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর দিয়ে বড় ঢেউ বয়ে যায়।
এরপর প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নেপালের দিকে নেমে আসে। এতে আনুমানিক ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়। সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর প্রায় ৪০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।
২০২১: চামোলি, ভারত
ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নন্দা দেবীর কাছে রোন্তি পিক থেকে বরফের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। শিলা, ধুলা ও বরফের স্রোত প্রায় দেড় হাজার মিটার নিচের উপত্যকায় নেমে আসে।
এরপর ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিভিন্ন গ্রাম এবং ভেসে যায় দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
২০২৬: নেপাল-তিব্বত সীমান্ত
সর্বশেষ বিপর্যয়টি ঘটেছে নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় সীমান্তে। পাহাড়ি নদীতে বরফ, কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে বিভিন্ন গ্রাম, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল ও তিব্বতে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চললেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

এর মধ্যে ঘটনাস্থলের নদীতে তৈরি নতুন হ্রদটির পানি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হ্রদটি ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আবারও বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: রয়টার্স
/অ