দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ছিল মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রণে। এবার সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে দেশটি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা—ডিআরডিওর তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি দেশীয় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কারিগরি যোগ্যতা, সনদ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রযুক্তির উৎপাদন ও সরবরাহের অধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
সরকারের লক্ষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায় দ্রুত শেষ করে ব্যাপক উৎপাদনে যাওয়া, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রযুক্তি অংশীদারকে প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথনের মতে, এই সিদ্ধান্তের আওতায় বিস্তৃত ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র আসবে। এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, রাডারবিধ্বংসী ও ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ভূমিতে হামলার জন্য ব্যবহৃত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও থাকতে পারে।
এতদিন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারত ডায়নামিকস দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে একচেটিয়া অবস্থানে ছিল। রামানাথনের ভাষ্য, নতুন সিদ্ধান্ত সেই একচেটিয়া ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বহু বছর ধরেই ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। তবে এবার তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে এসব ব্যবস্থার মূল উৎপাদক ও সমন্বয়কারী হওয়ার সুযোগ পাবে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় স্বনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভারতে উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ভারত নিজস্বভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভর করলেও রাশিয়া ও ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে। একই সময়ে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দুই সীমান্তেই অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
২০১৪ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ বিলিয়ন ডলারে। গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতের পর ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে তাগিদ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
রামানাথনের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতাও ভারতের এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চললে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের নির্ভুল হামলায় মজুত ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে চীনকে ঠেকাতে ভারতকে কয়েক সপ্তাহের কঠিন যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ভারত এরই মধ্যে তিন বাহিনীর সমন্বয়ে একটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কাজ করছে। এ বাহিনী কার্যকর করতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রয়োজন। আর সেই উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্পও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। গত জুনে দেশটি দেশীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। দেশটির ড্রোন শিল্পে ছয় শতাধিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছিল।
তবে শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্ভব নয়। রামানাথনের মতে, শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কত বড় পরিমাণে ক্রয়াদেশ দেয় তার ওপর। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। পর্যাপ্ত সরকারি ক্রয়াদেশ না থাকলে সেই বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
ভারতের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও এরই মধ্যে বেশ শক্তিশালী। চলতি বছরের মে মাসে দেশটি অগ্নি-৫-এর সফল পরীক্ষা চালায়। পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এই আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এ ছাড়া পৃথ্বী-১ থেকে অগ্নি-৪ পর্যন্ত বিভিন্ন পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ভারতের হাতে।
ভারত রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করে। গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু নিজেদের প্রয়োজন মেটানো নয়, ভারত এখন ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানিতেও এগোচ্ছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন ভারত থেকে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি ব্যাটারি কেনে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও ভারতের সঙ্গে এসব ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও ব্রহ্মোস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
তবে দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। দেশটির আমদানি করা অস্ত্রের ৪০ শতাংশের উৎস রাশিয়া।
এত সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্নও উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি হওয়ার ঘটনাগুলো এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তবে রামানাথনের মতে, ভারতে যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের চুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তারা প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং গোপনীয় তথ্য সুরক্ষার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি যাতে প্রতিপক্ষের হাতে না যায়, সেটি নিশ্চিত করার স্বার্থ ভারতের নিজেরই রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও ভারতকে মেনে চলতে হবে।
/অ