দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মার্কিন অবরোধের প্রভাবে চীনা ক্রেতাদের কাছে ইরানি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ প্রস্তাব কমে গেছে এবং চলতি সপ্তাহে তেলের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য চীনা ক্রেতাদের কাছে ইরানি তেলের যে পরিমাণ সরবরাহ প্রস্তাব করা হচ্ছে, তা জুলাই ও আগস্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সমুদ্রে থাকা আগের চালানগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ায় নতুন সরবরাহের সংকট তৈরি হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর গত ১৩ জুলাই ইরানের জাহাজ চলাচল ও বন্দরগুলোর ওপর ফের অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তেল বিক্রি বন্ধ করাই এ পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য। এর আগে যুদ্ধের কারণে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলাও তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
শিপ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ইরানের তেল রপ্তানি কমেছে। ওই সময়ের পর ইরানি অপরিশোধিত তেল বহনকারী বড় আকারের কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দেখা যায়নি। তবে অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ণয় করা কঠিন।
ইরানি তেলের সরবরাহ সংকট চীনের শানডং প্রদেশের ছোট ও স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলোর জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এসব শোধনাগারকে স্থানীয়ভাবে ‘টিপট’ বলা হয়। চীনের মোট পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের প্রধান ক্রেতা তারা।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত ছাড়ে বিক্রি হওয়া ইরানি তেলের কিছু চালান এবার আইসিই ব্রেন্টের চেয়েও বেশি দামে প্রস্তাব করা হচ্ছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতি ব্যারেলে প্রায় ২ ডলার প্রিমিয়াম চাওয়া হচ্ছে। অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানি লাইট ক্রুড প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৩ ডলার ছাড়ে বিক্রি হচ্ছিল।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধ কার্যকর হওয়ার আগে সমুদ্রে ভাসমান সংরক্ষণাগারে ইরানের প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। এখন তা কমে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার জলসীমায় ইরানি তেলের মজুতও স্বাভাবিক মাত্রার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।
কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু শু জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের পূর্বে মালয়েশিয়ার জলসীমায় প্রায় ৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল জাহাজে রয়েছে। তবে এর বেশির ভাগই ইতোমধ্যে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে নতুন ইরানি তেল সরবরাহ পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বলেই মনে করছেন তিনি।
সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে চীনের একটি ছোট শোধনাগার এ সপ্তাহে ব্রাজিলের লাপা ক্রুড কিনেছে। অন্য শোধনাগারগুলো ইরাকের বসরাহ ক্রুডের দিকে ঝুঁকছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
এনার্জি অ্যাসপেক্টসের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক সান জিয়ানান বলেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চীনের ছোট শোধনাগারগুলো এখন রাশিয়া ও ইরানের বাইরে অন্য উৎসের দিকে তাকাচ্ছে।
কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চীনে ইরানি তেল আমদানিও কমেছে। জুনে প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি হয়েছে, যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে তা বেড়ে ৮ লাখ ২৩ হাজার ব্যারেল হলেও আগস্টে এখন পর্যন্ত দৈনিক আমদানি নেমে এসেছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ব্যারেলে। গত বছর চীন গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছিল।
এর মধ্যে ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার জানান, সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞায় ইরানি তেল কেনা নির্দিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলোর কর্মকর্তারা। তবে অতীতে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া অনেক শোধনাগার এখনও ইরানি তেল পরিশোধন করছে বলে নতুন নিষেধাজ্ঞায় তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীন ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে। বেইজিং একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংঘাতের সমাধান করা সম্ভব নয়।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/