দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে দুই দশক আগে বন্ধ করে দেওয়া একটি ইহুদি বসতিতে নতুন করে বসতি স্থাপন শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্তের পর জেনিনের কাছে অবস্থিত কাদিম বসতিতে নতুন প্রজন্মের ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা ফিরেছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়লেও এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার তেল আবিব থেকে ৩০টি ‘অগ্রণী পরিবার’ কাদিমে পৌঁছায় বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক বসতিস্থাপনকারী পরিষদ। ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের সমর্থনে উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যেই তারা সেখানে যায়। ছোট ছোট দলে তারা সামরিক পাহারায় এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের গাড়িতে ইসরায়েলের নীল-সাদা পতাকা উড়ছিল। কেউ কেউ বিছানা, আসবাব ও নির্মাণসামগ্রী নিয়ে ট্রেলারও সঙ্গে আনেন।
জেনিনের আশপাশে ইহুদি বসতি স্থাপনের ওপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে ইসরায়েল সরকার। এ ঘটনায় ওই এলাকার ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ও বসতিস্থাপনকারীদের অবৈধ চৌকি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। ইসরায়েলি আইনেও এসব চৌকি অবৈধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেবা ও অর্থায়ন থেকে এগুলো সুবিধা পায়।
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ কাদিম পুনরায় চালুর অনুষ্ঠানে বলেন, উত্তর সামারিয়া থেকে ইহুদিদের বিতাড়নের ২১ বছর পর তারা সেই ‘ভুল সংশোধন’ করে কাদিমে ফিরে এসেছেন। অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আঞ্চলিক বসতিস্থাপনকারী পরিষদের প্রধান ইয়োসি দাগানও উপস্থিত ছিলেন। দাগান একদিন গাজায়ও ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের ফিরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জেনিন শহরের বাইরে ছোট একটি পাহাড়ে অবস্থিত কাদিম ২০০৫ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন সরকারের একতরফা বিচ্ছিন্নীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। একই সময় গাজা থেকে সব ইহুদি বসতিস্থাপনকারী ও ইসরায়েলি সেনা সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পশ্চিম তীরের গ্যানিম, সানুর ও হোমেশ বসতিও ভেঙে দেওয়া হয়।
তখন এসব বসতিকে বিচ্ছিন্ন, রক্ষায় ব্যয়বহুল এবং কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কাদিমের পাহাড়ে আবারও সাদা রঙের ট্রেলার বসানো শুরু হয়।
স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি কৃষক জানান, ছোটবেলায় তিনি কাদিম বসতি গড়ে উঠতে দেখেছিলেন। ২০ বছর পর বসতিস্থাপনকারীদের উচ্ছেদও দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, তখন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিরা পাশাপাশি বসবাস করতেন এবং নিজেদের মতো জীবনযাপন করতেন। কিন্তু এখন তাদের ফিরে আসায় তিনি আতঙ্কিত।
তিনি জানান, তাঁর পরিবারের সদস্যদের সবজি ও সাইট্রাস বাগান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বলা হয়েছে, সেখানে তাদের কোনো জায়গা নেই। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার হাইফা থেকে এই এলাকায় এসে বসতি গড়েছিল।
কাদিম পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালে উচ্ছেদ হওয়া চারটি বসতির সবগুলোতেই আবার ইহুদি বসতি স্থাপনের সুযোগ তৈরি হলো। গ্যানিম, সানুর ও হোমেশে এরই মধ্যে পরিবারগুলো বসবাস শুরু করেছে।
তবে জেনিন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণের সামগ্রিক পরিকল্পনার তুলনায় এসব বসতি খুবই ছোট অংশ। ২০২২ সালের শেষ দিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পশ্চিম তীরে ১০০টির বেশি নতুন বসতি অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি উত্তর পশ্চিম তীরে।
শান্তি আন্দোলন ‘পিস নাও’-এর সেটেলমেন্ট ওয়াচ কর্মসূচির পরিচালক হাগিত অফরানের মতে, জেনিনে দ্রুত বসতি নির্মাণ ইসরায়েলি সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। অক্টোবরের নির্বাচনের আগে পশ্চিম তীরে যত বেশি সম্ভব বসতি সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা চলছে বলে মনে করেন তিনি।
জেনিনের পশ্চিমে এমেক দোতান নামের আরেকটি নতুন বসতি গত রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। সেখানে এখন প্রায় দুই ডজন ইহুদি পরিবার বসবাস করছে।
বসতির পাশের ফিলিস্তিনি গ্রামে বসবাসকারী শিক্ষক সামের জাবের বলেন, প্রথমে বুলডোজার, এরপর একের পর এক ট্রেলার এনে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। পরিবারগুলো সেখানে আসার আগেই সমস্যার শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, বসতিস্থাপনকারীদের দল প্রায়ই তাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের ভিডিও করে। এমনকি গভীর রাতেও শক্তিশালী আলো জানালার দিকে তাক করে রাখা হয় এবং বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করা হয়।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন সামের। তিনি বলেন, ভয় এখন তাদের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় বাড়ির একটি পাশ কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।
জেনিনের আশপাশে নতুন বসতির পাশাপাশি দুটি নতুন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির নির্মাণকাজও দ্রুত এগোচ্ছে। এর মধ্যে জেনিন শরণার্থী শিবিরের পাশে ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এটিই প্রথম নতুন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ বলে দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনেই জাবরিয়াত এলাকায় ওই সামরিক স্থাপনা নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেনিনের ফিলিস্তিনি গভর্নর কামাল আবু আল-রুব আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শরণার্থী শিবিরের আশপাশের জমি দখল ভবিষ্যতে সেখানে বসতিস্থাপনকারীদের আবাসন তৈরির পরিকল্পনার ইঙ্গিত হতে পারে। এতে জেনিন শহরের ভেতরেই বিভাজন তৈরি হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
তিনি বলেন, গত দুই দশক বসতিস্থাপনকারীদের উপস্থিতি না থাকায় জেনিনে মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিল। এখন বসতি ও হামলার কারণে তাদের চলাচল সীমিত হচ্ছে, সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, জমি বুলডোজার দিয়ে সমতল করা হচ্ছে এবং গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে।
জেনিনে পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত। কয়েক সপ্তাহ আগেও কাদিম থেকে উত্তর পশ্চিম তীর হয়ে ইসরায়েলমুখী সড়কের পাশে থাকা একটি ক্যাফেতে মানুষ বসে সময় কাটাতেন। এখন সেই ক্যাফেসহ আশপাশের বহু ফিলিস্তিনি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
অক্টোবরে ইসরায়েলি নির্বাচন সামনে রেখে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংসের সংখ্যা এবং নতুন বসতিস্থাপনকারীদের আনা ট্রেলারের সংখ্যা যেন ক্রমেই সেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন হিসাব হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/