দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জটিল ইস্যুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পছন্দের কৌশল হলো সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া। আর অবস্থান নিতেই হলে তিনি সাধারণত এমন কিছু অস্পষ্টতা রেখে দেন, যাতে পরিস্থিতি জটিল হলে পরে সরে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোডম্যাপের ক্ষেত্রে এবার সেই কৌশল দেখা গেল না।
রোববার সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভা বৈঠকের শুরুতে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েল ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা নথি গ্রহণ করছে না। বিষয়টি স্পষ্ট করতে তিনি একই কথা দুবার বলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, অনেকে বলছেন তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেননি। তাই তিনি আবারও বলছেন, ইসরায়েল ১৫ দফা নথি গ্রহণ করছে না।
নেতানিয়াহুর এমন সরাসরি অবস্থান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে ব্যর্থতার পর গাজায় একটি সাফল্য দেখানোর জন্য ট্রাম্প যখন নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন, তখন তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রায় ১০ দিন আগে গাজা ইস্যুতে আবারও সক্রিয় হন ট্রাম্প। তাঁর বোর্ড অব পিস হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে ঘোষণা করেন তিনি। বোর্ডের শীর্ষ দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ পরে জানান, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্র সমর্পণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ হামাস অস্ত্র জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের একটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়।
তবে নেতানিয়াহুর বক্তব্যে সেই সম্ভাবনা কার্যত নাকচ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনো অবস্থান থেকে সরে যাবে না। তাঁর ভাষায়, নিরস্ত্রীকরণ বলতে ভারী অস্ত্র, হালকা অস্ত্রসহ সব ধরনের অস্ত্র সমর্পণ বোঝায়। এটি বাস্তব নিরস্ত্রীকরণ হতে হবে, কাগুজে বা লোক দেখানো কোনো প্রক্রিয়া নয়।
রোববার বিকেল পর্যন্ত এ বিষয়ে ট্রাম্প সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার প্রতি সমর্থনের একটি বক্তব্য শেয়ার করেন।
অন্যদিকে ম্লাদেনভ ইসরায়েলের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এখনও পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তবে হামাসকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁর মতে, অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া এবং সেগুলোকে অকার্যকর করার বিষয়টি যাচাই করা গেলে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।
গাজা ইস্যুতে ইসরায়েল ও হামাস—দুই পক্ষেরই ব্যর্থতার দায় একে অপরের ওপর চাপানোর স্বার্থ রয়েছে। হামাস অবশ্য নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছে। তারা রোডম্যাপের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বোর্ড অব পিসকে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে হামাস সত্যিই সব অস্ত্র ত্যাগ করবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। গাজায় দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কর্তৃত্ব ও টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে অস্ত্রকে ধরে রেখেছে সংগঠনটি।
প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পকে এত প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন কেন নেতানিয়াহু? এর অন্যতম বড় কারণ ইসরায়েলের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন আর ১২ সপ্তাহেরও কম দূরে। বিভিন্ন জরিপে এখনো নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের সাধারণত একাধিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠন করতে হয়। নেতানিয়াহু বরাবরই নির্বাচনের পর নয়, নির্বাচনের আগেই সম্ভাব্য জোটের হিসাব-নিকাশ শুরু করতে পছন্দ করেন। নির্বাচনের পর ক্ষমতায় থাকতে হলে তাঁকে উগ্র ডানপন্থী মিত্রদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
ফলে গাজা নিয়ে ট্রাম্পের রোডম্যাপের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে আগের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবির মুখে নেতানিয়াহুর জন্য তাদের অবস্থান উপেক্ষা করা কঠিন। বিশেষ করে গাজার একটি পরীক্ষামূলক এলাকায় পুনর্গঠনকাজ শুরুর বিষয়ে নেতানিয়াহু নীরবে অনুমোদন দিয়েছেন—এমন খবর প্রকাশের পর তাঁর ওপর ডানপন্থীদের চাপ আরও বেড়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু উগ্র ডানপন্থীদের সন্তুষ্ট করার কৌশল হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। ইসরায়েলি ভোটারদের বড় একটি অংশ ট্রাম্পের প্রতি ইতিবাচক হলেও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থানকে তারা ভুল মনে করেন।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও এ অবস্থান থেকে আলাদা হওয়া কঠিন। ম্লাদেনভ ইসরায়েলিদের স্বার্থের কথা তুলে ধরে বলেছেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেই ২০২৩ সালের মতো আরেকটি বড় হামলার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের জন্য এমন বার্তা নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা ভোট এনে দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এদিকে বোর্ড অব পিসের এক মার্কিন কর্মকর্তা সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক সংযম এবং হামলার নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, পর্দার আড়ালে সহযোগিতা চলছে।
তবে গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার জন্য এসব উদ্যোগ এখনো খুব সামান্য স্বস্তির কারণ। কারণ গাজাবাসী এখনও এই আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার বাইরে, অথচ শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎই এসব সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব বহন করবে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/