দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় চীনের প্রযুক্তি খাতে চাকরি ছিল উচ্চ বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও মধ্যবিত্ত জীবনের নিশ্চয়তার প্রতীক। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার, কর্মী ছাঁটাই এবং প্রযুক্তি খাতে নিয়োগ সংকোচনের কারণে হাজারো সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিকর্মী এখন দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের মুখে পড়ছেন।
চীনের প্রযুক্তি খাতে বহুল আলোচিত ‘৯৯৬’ কর্মসংস্কৃতি—সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ—একসময় কর্মীদের কাছে কঠোর হলেও কাঙ্ক্ষিত উচ্চ আয়ের বিনিময়ে মেনে নেওয়ার মতো বাস্তবতা ছিল। এখন সেই কাজের সুযোগটিই অনেকের কাছে অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এআই-নির্ভর কোডিং ও সফটওয়্যার তৈরির প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হওয়ায় একই পরিমাণ কাজ কমসংখ্যক কর্মী দিয়ে সম্পন্ন করার প্রবণতা বাড়ছে।
প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি চিত্র উঠে এসেছে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। এক নারী তাঁর স্বামীর একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারানোর পর টানা ৫৯ দিন কর্মহীন থাকার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ওই সময়ে তিনি কোনো সাক্ষাৎকারের সুযোগও পাননি বলে জানান। তাঁর বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মধ্যবয়সী প্রযুক্তিকর্মীদের বেকারত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
চীনের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতে কর্মসংস্থান কয়েক বছর আগেও ব্যাপক ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে এ খাতে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮১ লাখ। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীদের বেতনও অন্যান্য অনেক পেশার তুলনায় আকর্ষণীয় ছিল। বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে আয় আরও বেশি হওয়ায় তরুণদের কাছে টেনসেন্ট, আলিবাবা ও বাইটড্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি ছিল কাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার।
কিন্তু এখন সেই প্রতিষ্ঠিত ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। চীনের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত দেড় বছরে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর সামনে এসেছে। আলিবাবা, বাইদু ও জেডি ডটকমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমানোর পাশাপাশি নতুন নিয়োগও সংকুচিত হয়েছে। ফলে অভিজ্ঞ কর্মীরাও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এআইয়ের উৎপাদনশীলতা, কমছে কর্মীর প্রয়োজন প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জেনারেটিভ এআই ও এআই কোডিং টুলের দ্রুত বিকাশকে। এসব প্রযুক্তি এখন কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনে এমন কিছু কোড তৈরি করতে পারছে, যা আগে একজন প্রকৌশলীর দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো। শিল্পসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, ভবিষ্যতে একজন দক্ষ প্রকৌশলী একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক এআই সিস্টেম পরিচালনা করতে পারবেন। এর ফলে সফটওয়্যার তৈরিতে আগের তুলনায় অনেক কম কর্মী প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কয়েকজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীই বড় একটি দলের সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে পারবেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব শুধু জুনিয়র কর্মীদের ওপর নয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে যেসব পদে কাজকে সফটওয়্যার ও এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব, সেখানে কর্মীসংখ্যা কমানোর প্রবণতা বাড়ছে।
চীনের প্রযুক্তি খাতে বয়সও এখন বড় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক কম বয়সী কর্মীদের নিয়ে দল গঠনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীরা চাকরি হারানোর পর নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন বলে অভিযোগ করছেন। একজন বাইটড্যান্সের সাবেক কর্মী জানান, নতুন চাকরি পাওয়ার চেয়েও তাঁর কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে একটি টেকসই জীবনযাপন করা যায়। কারণ নতুন চাকরি পেলেও ভবিষ্যতে আবার ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
আরেক নারী, যিনি আলিবাবায় ২২ বছর কাজ করেছেন, শেষ পর্যন্ত চাকরি হারান। প্রতিষ্ঠানের শুরুর সময় থেকে বড় হয়ে ওঠার পুরো সময়ের সাক্ষী হয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ছাঁটাইয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কম খরচের শহরে চলে গিয়ে সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে জীবন চালানোর কথা ভাবছেন।
চাকরি হারানোর সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে পরিবারগুলোর ওপর। উচ্চ বেতনের ওপর নির্ভর করে অনেক প্রযুক্তিকর্মী বাড়ি কিনেছেন, সন্তানদের শিক্ষার পরিকল্পনা করেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় নিয়েছেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর সেই ঋণের কিস্তি, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় ও দৈনন্দিন খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একজন নারী প্রকৌশলী, যিনি একটি শীর্ষস্থানীয় ‘৯৮৫’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন, ছয় মাস ধরে বেকার বলে জানা গেছে। তাঁর মাসিক প্রায় ২ হাজার ৪০০ ডলারের বাড়ির ঋণ রয়েছে এবং সঞ্চয়ও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
আরেক তরুণ কর্মী মাত্র ২৭ বছর বয়সেই চাকরি হারিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—এত অল্প বয়সে কেন তাঁকে ‘মধ্যজীবনের সংকটের’ মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
একসময় মর্যাদার প্রতীক, এখন অনিশ্চয়তার পেশা চীনের প্রযুক্তি খাতে কর্মীদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা নিয়ে বহু বছর ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ৯৯৬ সংস্কৃতির কারণে অতিরিক্ত চাপ, ঘুমের ঘাটতি ও শারীরিক-মানসিক অবসাদের অভিযোগও ছিল ব্যাপক। কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপের কারণে তরুণ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও দেশটির প্রযুক্তি খাতে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এখন সমস্যার ধরন বদলে গেছে। অতিরিক্ত কাজের চাপের পাশাপাশি কর্মীর সামনে দাঁড়িয়েছে চাকরি হারানোর ভয়। কর্মীদের অনেকেই ছুটির দিনেও নতুন প্রযুক্তি, গবেষণাপত্র ও দক্ষতা শেখার পেছনে সময় দিচ্ছেন—কারণ সামান্য পিছিয়ে পড়লেই চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
শাংহাইয়ের এক ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপার জানান, তিন মাস ধরে বেকার থাকার পর তাঁর চাকরির সাক্ষাৎকারগুলোও মাত্র পাঁচ মিনিটের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সাত বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারানো কর্মীর সংখ্যাও কম নয়।
এমএস/