দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্বের অনেক দেশেই তরুণদের জন্য শিক্ষানবিশ বা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকের সংখ্যা বাড়ছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসার কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
চীনে প্রথম প্রকট হয়ে ওঠা তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছর কেনিয়া, পেরু, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে বেকারত্ব, দুর্বল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব তরুণদের রাস্তায় নামিয়ে আনে।
চলতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোতেও বিক্ষোভে যুব বেকারত্বের উদ্বেগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারতে এই উদ্বেগ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থানেও ভূমিকা রেখেছে। ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া প্রকল্প হিসেবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণ করে।
সাধারণত ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী যেসব তরুণ-তরুণী সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন কিন্তু চাকরি পাচ্ছেন না, তাদের বেকারত্বের হারকে যুব বেকারত্ব বলা হয়। অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের সুযোগ কম থাকায় তরুণদের বেকারত্ব সাধারণত সামগ্রিক বেকারত্বের চেয়ে বেশি হয়। তবে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশে এই ব্যবধান আরও বাড়ছে।
চীন এ সমস্যার অন্যতম প্রথম উদাহরণ। দেশটিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও স্নাতকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়ে এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি খোঁজা এবং যোগ্যতার তুলনায় কম মানের চাকরিতে যুক্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানিয়েছে, মে মাসে দেশটির শহরাঞ্চলে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের সরকারি বেকারত্বের হার ছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
গত ১১ মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন হলেও দেশটির প্রায় ৫ শতাংশ সামগ্রিক বেকারত্বের হারের তুলনায় তা তিনগুণের বেশি। ২০২৩ সাল থেকে চীনের যুব বেকারত্বের পরিসংখ্যানে লক্ষাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। ফলে আগের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান পরিসংখ্যানের তুলনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ধীর সামাজিক অগ্রগতি কিংবা প্রজন্মগত বৈষম্যের অনুভূতি শুধু চীনের সমস্যা নয়। অন্যান্য দেশেও প্রযুক্তির পরিবর্তন, ধীরগতির নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং চাকরির বাজারে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সঙ্গে একটি নিরাপদ হোয়াইট-কলার ক্যারিয়ারের সম্পর্ককে দুর্বল করে দিয়েছে।
স্নাতকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি তরুণদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে আরেকটি বিষয়; এআইয়ের কারণে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের চাকরি ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কা। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনও নিশ্চিত নন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফলিত অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক গোলো হেনসেকে বলেন, যুক্তরাজ্যে স্নাতকদের জন্য নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি অ-স্নাতকদের চাকরির তুলনায় দ্রুত কমেছে। এসব চাকরির অনেকগুলোই এআইয়ের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সম্পর্কিত।
তার গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত এআই গ্রহণ করেছে, সেখানে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে বেড়েছে। অন্যদিকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের কর্মসংস্থান স্থিতিশীল ছিল। তবে সাধারণ ব্যবসায়িক চক্রের তুলনায় এখন পর্যন্ত এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যুব কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞ সারা এল্ডারও মনে করেন, তরুণদের কর্মসংস্থান স্থবির হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে এআই। তবে তার মতে, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কারণ রয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি খুব বেশি গতিশীল নয়। ফলে চাকরিপ্রার্থী তরুণদের তুলনায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
এর সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের নিয়োগের মানদণ্ড আরও কঠোর করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ফলে অল্প কাজের অভিজ্ঞতা থাকা তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এসব চাকরি না পেলে তরুণরা ভবিষ্যতে ভালো চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও হারাতে পারেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে ভোগ কমে যাওয়া, বাড়ির মালিকানার হার কমা এবং পরিবার গঠনে বিলম্বের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে বাড়তে পারে তরুণদের মধ্যে হতাশাও।
তবে শিক্ষা, শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হেনসেকে বলেন, ইউরোপজুড়ে তরুণদের জন্য ব্যাপক কোনো কর্মসংস্থান সংকট এখনো দেখা দেয়নি।
২০২২ সাল থেকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের হার অস্ট্রিয়া ও জার্মানিসহ অল্প কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে বেড়েছে। তবে দক্ষিণ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে এই হার কমেছে।
হেনসেকে বলেন, ইউরোপের জন্য যুব বেকারত্ব নতুন কোনো সমস্যা নয়। আর্থিক সংকটের পর এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। এরপর সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে সেই দেশগুলোতে, যেগুলো তখন সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। তবে আইএলওর তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১১টি অঞ্চলের মধ্যে আটটিতেই যুব বেকারত্বের হার বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
বিশেষ করে উৎপাদন, নির্মাণ ও পরিষেবা খাতে তরুণদের চাকরির সুযোগ কমেছে। তবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো উচ্চ দক্ষতা ও জ্ঞাননির্ভর কারিগরি খাতে তরুণদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো। বেশিরভাগ দেশেই এসব খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে বলে জানান এল্ডার।
জার্মানিতে চলতি বসন্তে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াইর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্নাতক হওয়ার পর উপযুক্ত চাকরি পাওয়ার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা দুই বছর আগের তুলনায় এখন অনেক কম আশাবাদী।
নিয়োগকর্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এখন শিক্ষার্থীদের কাছে বেতনের চেয়ে চাকরির নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সারা এল্ডারের মতে, নীতিনির্ধারক ও নিয়োগকর্তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করে তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের প্রক্রিয়াটিকেও সহায়তা করতে হবে।
তরুণদের দক্ষতার ঘাটতিকে এ সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন গোলো হেনসেকে। তার মতে, বর্তমান সময়ের স্নাতকেরা কয়েক বছর আগে পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের তুলনায় কম যোগ্য; এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একইভাবে, নিয়োগকর্তারা যে দক্ষতাগুলো চান, সেগুলোও রাতারাতি বদলে যায়নি। অন্য সবকিছুর চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই তরুণদের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি উন্নতি করতে পারে।
কে