দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইউক্রেনের শহরগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। উচ্চগতির এসব ক্ষেপণাস্ত্র খুব কম সময়ের সতর্কবার্তায় আঘাত হানতে পারে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ায় রুশ হামলায় ইউক্রেনের বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বাড়ছে।
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এর জবাবে রাশিয়া ইউক্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে শহরগুলোতে হামলা জোরদার করেছে।
চলতি সপ্তাহের এক রাতেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আশপাশে দুই ডজনের বেশি ব্যালিস্টিক ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই ঠেকাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।
গত ৩০ জুন রাতে কিয়েভ ও লভিভ অঞ্চলে চালানো আরেকটি বড় হামলায় রাশিয়া চারটি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৬১টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি আক্রমণকারী ড্রোন ব্যবহার করে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সংকটে ইউক্রেন
ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো ঠেকাতে সক্ষম কয়েকটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট অন্যতম। কিন্তু প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী গোলার মজুত কমে যাওয়ায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়ার ছোড়া প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারত ইউক্রেন। কিন্তু গত এক বছরে এই হার কমে ১৬ থেকে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ব্যবস্থা থাকলে সাম্প্রতিক হামলায় নিহতদের অনেকের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কতটা ভয়ংকর
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নতুন কোনো অস্ত্র নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ভি-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। পরে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও শহর লক্ষ্য করে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়।
তবে আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ও প্রযুক্তি অনেক উন্নত। রাশিয়ার স্বল্পপাল্লার ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির ছয় থেকে সাত গুণ গতিতে ছুটতে পারে এবং এতে সর্বোচ্চ ৭০০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব।
রাশিয়া মাঝারি পাল্লার অতি উচ্চগতির ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কয়েকবার ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও স্থল লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও বড় হুমকি
ইউক্রেনের শহরগুলোর ওপর রাশিয়ার হামলাকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়—ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
রাশিয়া ইরানি নকশার শাহেদ ড্রোনের রুশ সংস্করণ গেরান-২ ব্যাপকভাবে উৎপাদন করছে। এসব ড্রোনে জেট ইঞ্জিন ও বিভ্রান্তিকর ড্রোনসহ বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় ইউক্রেন এসব ড্রোন ঠেকাতে বেশ কিছু কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত ড্রোনের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বহন করে এবং নিচু দিয়ে উড়ে রাডারের নজর এড়ানোর চেষ্টা করে। রাশিয়ার কালিবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সমুদ্রের ওপর প্রায় ২০ মিটার এবং স্থলভাগের ওপর প্রায় ৫০ মিটার উচ্চতায় উড়তে পারে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক দূত ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউক দাবি করেছেন, উত্তর কোরিয়ার একটি কেএন-২৩ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের একটি বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এতে ছয়জন নিহত হন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু।
তার দাবি, কেএন-২৩ রাশিয়ার ইস্কান্দারের প্রায় হুবহু সমতুল্য এবং উভয় ক্ষেপণাস্ত্রে পশ্চিমা তৈরি অভিন্ন উপাদানও রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট উৎপাদন নিয়ে চাপ
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী গোলার সংকট মোকাবিলায় ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা যৌথভাবে উৎপাদনের চেষ্টা করছে। গত মাসে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বললেও পরে এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিহতকারী গোলার মজুত যুদ্ধ শুরুর তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সামরিক বিশ্লেষক দারা ম্যাসিকট বলেছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এখনো অত্যন্ত কঠিন একটি সমস্যা। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইউক্রেনকে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে।
এদিকে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও বাড়িয়ে চলায় ইউক্রেনের শহরগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। পর্যাপ্ত প্রতিহতকারী ব্যবস্থা না পাওয়া গেলে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ঘাটতি দেশটির বেসামরিক জনগণের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
/অ