দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে হামাস নেতাদের বৈঠকে গাজায় ধাপে ধাপে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়েছে। তবে হামাস এই সমঝোতাকে ‘খসড়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও বলেছেন, হামাস সত্যিই অস্ত্র সমর্পণ করবে কি না—এ নিয়ে ইসরায়েল গভীর সন্দেহে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় হামাস এবং অন্যান্য সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার ভাষায়, এটি স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং নিরস্ত্রীকরণ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, এই সমঝোতা গাজায় নতুন একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠনের পথ তৈরি করবে, যা ‘বোর্ড অব পিস’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে গাজাকে আর সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হবে না এবং ইসরায়েল তার প্রাপ্য নিরাপত্তা পাবে।
তবে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হামাসের একটি সূত্র জানায়, খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী ভারি অস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে সংরক্ষণ করা হবে এবং সেগুলো ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করা হবে না।
হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আগে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে হামাস কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে—এ বিষয়ে ইসরায়েল খুবই সন্দিহান। তবে তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস হামাস সমঝোতা মেনে চলবে। তা না হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত হতাশ হবেন।
নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া কতদিন চলবে, তা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। শান্তি বোর্ডের এক কর্মকর্তা এর সময়সীমা ২০০ থেকে ৩২০ দিন হতে পারে বলে জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা সেই সময়সীমার গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণার আগে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তার ভাষ্য, যেকোনো প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বশর্ত হিসেবে গাজা থেকে হামাসের সব অস্ত্র অপসারণ এবং পুরো উপত্যকার সম্পূর্ণ সামরিকমুক্তকরণ চায় ইসরায়েল। তিনি আরও বলেন, আলোচনায় থাকা ১৫ দফা নথিতে এসব দাবির সন্তোষজনক সমাধান নেই এবং সে কারণেই ইসরায়েল আপত্তি জানিয়েছে।
এদিকে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে হামাস নেতারা মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনার ভিত্তি ছিল ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ এর উপস্থাপিত পরিকল্পনা।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান এবং গাজার পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ট্রাম্প এই ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করেন। তিনি নিজেই বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত বছর তিনি বলেছিলেন, এই বোর্ড গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন তদারক করবে।
গাজার জন্য ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ এর দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, তাদের লক্ষ্য এমন একটি পুনর্গঠিত গাজা, যা ফিলিস্তিনিদের দ্বারা পরিচালিত হবে, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিতে থাকবে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অর্থবহ রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাবে।
তবে গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় জড়িত কর্মকর্তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পরিকল্পনায় মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথাও রয়েছে।
অস্ত্র হস্তান্তরই আলোচনার সবচেয়ে বড় জটিল বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। হামাস চায়, ইসরায়েল গাজায় হামলা বন্ধের অঙ্গীকার করুক এবং তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করুক। তবে হালকা বা ব্যক্তিগত অস্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং হামাসের নতুন অবস্থান ইসরায়েল বা শান্তি বোর্ড গ্রহণ করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আলোচনায় যুক্ত এক কূটনীতিক জানান, পরিকল্পনায় সুড়ঙ্গ, অস্ত্রের মজুত এবং অস্ত্র উৎপাদন স্থাপনা ধ্বংসের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষে গাজায় কোনো সশস্ত্র অবকাঠামো অবশিষ্ট থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, এটি আস্থার ভিত্তিতে হওয়া কোনো সমঝোতা নয়; বরং শর্তনির্ভর একটি চুক্তি।
এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজার ৭০ শতাংশ এলাকায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে কত সেনা মোতায়েন করা হবে এবং ইসরায়েলি বাহিনী শেষ পর্যন্ত গাজা ছাড়বে কি না, তা-ও এখনো অনিশ্চিত।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার পৃথক ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু, এক নারী ও তিন পুরুষ রয়েছেন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা গাজায় হামাসের যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও তা বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এক হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক, নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামাসসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। হামাস সাধারণত নিজেদের হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে না।
সূত্র: রয়টার্স
/অ