দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীনের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ঝাং ঝিডং (৩৯) মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক ফেন্টানিল সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিচারাধীন এবং সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সিনালোয়া কার্টেলের বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, কার্টেলের সদস্যদের কাছে ঝাং ‘ব্রাদার ওয়াং’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের রাসায়নিক কারখানা থেকে ফেন্টানিল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান (প্রিকার্সর) সংগ্রহ করে মেক্সিকোর গোপন ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি।
ফেন্টানিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম ওপিওয়েড, যা হেরোইনের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর এ মাদকের কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মাত্র কয়েকটি লবণের দানার সমপরিমাণ ফেন্টানিলও প্রাণঘাতী হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেন্টানিল পাচারকারীদের ‘নার্কো-সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং এই মাদক ও এর উপাদানকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফেন্টানিল পাচারকে কেন্দ্র করেই তিনি চীন, মেক্সিকো ও কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডে
আদালতের নথি অনুযায়ী, ঝাং ২০১০ সালে চীনের মর্যাদাপূর্ণ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্প্যানিশ ভাষায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। এক বছর পর তিনি একটি চীনা মালিকানাধীন খনি প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য মেক্সিকোতে যান এবং দ্রুতই উচ্চপদে উন্নীত হন।
তার সাবেক সহকর্মীরা জানান, ঝাং স্প্যানিশ ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার। ব্যবসার স্বার্থে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অপরাধচক্রের সদস্যদের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
মাদক ও অর্থপাচারের অভিযোগ
মার্কিন আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ঝাং একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক মাদক পাচার ও অর্থপাচার চক্র পরিচালনা করছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি চীনের রাসায়নিক সরবরাহকারী এবং মেক্সিকোর মাদক কার্টেলের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন।
সিনালোয়া কার্টেলের এক সদস্যের দাবি, ঝাংয়ের মাধ্যমে চীন থেকে ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিক উপাদান আকাশ ও সমুদ্রপথে মেক্সিকোতে আনা হতো। এরপর সেগুলো গোপন ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে ফেন্টানিল উৎপাদন করা হতো।
ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন ও মানবিক মূল্য
কার্টেলের এক সাবেক সদস্য, যিনি নিজেকে ফেন্টানিল প্রস্তুতকারক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, দাবি করেন যে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় তিনি অন্তত পাঁচজন সহকর্মীকে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে মারা যেতে দেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করলেও অনেক সময় রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি করত।
অন্যদিকে, আরেক কার্টেল সদস্য জানান, তার নিজের এক আত্মীয় ফেন্টানিল সেবনে মারা গেলেও জীবিকার অভাবে তিনি এই ব্যবসা ছাড়তে পারেননি।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অভিযোগ
মেক্সিকোর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি, ঝাংয়ের অবৈধ কার্যক্রম আমেরিকা, ইউরোপ, চীন ও জাপান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইট ক্রাইম-এর গবেষক ভিক্টোরিয়া ডিটমারের মতে, ঝাংয়ের মতো মধ্যস্থতাকারীরা চীনের রাসায়নিক উৎপাদক এবং মেক্সিকোর মাদকচক্রের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করেন।
মেক্সিকান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঝাং ১,০০০ কেজির বেশি কোকেন, ১,৮০০ কেজি ফেন্টানিল এবং ৬০০ কেজি মেথামফেটামিন পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া বছরে ১৫ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি মাদক ব্যবসার অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
২০২৪ সালে মেক্সিকোতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঝাং একবার নাটকীয়ভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে তাকে পুনরায় আটক করে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। বর্তমানে নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তার আইনজীবী চলমান মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং ঝাং আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
এমএস/