দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মানব মস্তিষ্কের অন্যতম জটিল ও কম-অনুসন্ধানকৃত অংশ ‘ব্রেইনস্টেম’ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ভারতের বিজ্ঞানীরা। ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজের সুদা গোপালকৃষ্ণন ব্রেইন সেন্টারের গবেষকরা বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মানব ব্রেইনস্টেম অ্যাটলাস তৈরি করেছেন, যা কোষীয় (সেলুলার) স্তর পর্যন্ত মস্তিষ্কের গঠন বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেবে।
গবেষকদের তৈরি এই ডিজিটাল অ্যাটলাসের সংক্ষিপ্ত নাম ‘অ্যাঙ্কর’ । এতে ভ্রূণ, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের ৫০০টিরও বেশি টিস্যু সেকশন বিশ্লেষণ করে ব্রেইনস্টেমের একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চ-রেজোলিউশনের মাইক্রোস্কোপিক চিত্র ব্যবহার করে নির্মিত এই অ্যাটলাসে ২০০টিরও বেশি স্নায়ুকোষের গুচ্ছ (সেল ক্লাস্টার) ও স্নায়ুপথ শনাক্ত করা হয়েছে। আট ধরনের রাসায়নিক চিহ্ন (কেমিক্যাল মার্কার) ব্যবহার করে বিভিন্ন কোষের ধরন পৃথকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা ব্রেইনস্টেমের গঠন সম্পর্কে এখন পর্যন্ত অন্যতম স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে।
ব্রেইনস্টেম আকারে ছোট হলেও এটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, ঘুম, জাগরণ, চলাফেরা এবং মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এই অংশের সামান্য ক্ষতিও প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু এর জটিল গঠন দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই অ্যাটলাস চিকিৎসা ইমেজিং এবং কোষীয় পর্যায়ের রোগতত্ত্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমিয়ে আনবে। এতে এমআরআই স্ক্যান থেকে শুরু করে পৃথক স্নায়ুকোষ পর্যন্ত একই কাঠামোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের স্নায়ুবিজ্ঞানী শুভা তোলে এই প্রকল্পকে প্রকৌশল, স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ভারতকে আন্তর্জাতিক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সহযোগী নিউরোপ্যাথোলজিস্ট রেবেকা ফোলকার্থ, যিনি এই প্রকল্পে সহযোগিতা করেছেন, বলেন, এতদিন মস্তিষ্কের অল্প কয়েকটি টিস্যু নমুনা পরীক্ষা করেই আলঝেইমারের মতো রোগ নির্ণয় করতে হতো। নতুন অ্যাটলাসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের গঠন ও কোষীয় তথ্যকে একই প্ল্যাটফর্মে দেখা সম্ভব হবে, যা দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ করেছে।
গবেষকরা অ্যাটলাসটি বিশ্বের বিজ্ঞানী, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও নিউরোসার্জনদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তাদের আশা, এটি পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, স্ট্রোক, অটিজম, হঠাৎ শিশু মৃত্যুর সিনড্রোম এবং কোভিড-১৯–পরবর্তী স্নায়বিক জটিলতা নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশিষ্ট স্নায়ুবিজ্ঞানী পার্থ মিত্র বলেন, এ ধরনের বিস্তারিত ব্রেইন অ্যাটলাস সুস্থ ও রোগাক্রান্ত মস্তিষ্কের কোষীয় পার্থক্য শনাক্ত করতে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে স্নায়ুরোগের কারণ ও চিকিৎসা উদ্ভাবনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রায় ২০ জন গবেষক ১৮ মাস ধরে ২০০টিরও বেশি মস্তিষ্কের টিস্যু সেকশন হাতে বিশ্লেষণ করে এমআরআই, মাইক্রোস্কোপিক তথ্য ও ত্রিমাত্রিক পুনর্গঠন একত্রিত করে এই ডিজিটাল অ্যাটলাস তৈরি করেছেন। বর্তমানে এসজিবিসিতে ২০০-এরও বেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে মানব মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই অর্জন শুধু ভারতের গবেষণা সক্ষমতারই প্রমাণ নয়, বরং মানব মস্তিষ্কের অজানা রহস্য উন্মোচনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এমএস/