দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেছেন, ‘লেবানন যুদ্ধ’ শেষ করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শেষে পাকিস্তান ও কাতারের দেয়া যৌথ বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ক্লান্তিহীন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় লেবানন যুদ্ধ শেষ করতে বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।’ তবে তিনি শেষ করেন এই বলে যে, প্রথম ‘আসল পরীক্ষা’ হবে ‘লেবানন ডি-কনফ্লিকশন সেল’।
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরা চলা যুদ্ধের অবসানে গত বুধবার (১৭ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪ দফা সমঝোতায় পৌঁছায়, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ ও উত্তেজনা কমানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সমঝোতার ভিত্তিতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে গত শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলার প্রতিবাদে তা স্থগিত করে ইরান। সেই সঙ্গে আবারও বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালী।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার মধ্যে রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান ও কাতারের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনার। আর ইরানের পক্ষে সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত, তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সুইজারল্যান্ডে চলছে ওয়াশিংটন-তেহরানের দরকষাকষি। প্রথম ৮০ মিনিটের উদ্বোধনী সেশনের পরই ট্রাম্পের হুমকির জেরে টেবিল ছাড়েন ইরানি প্রতিনিধিদল। এতে আলোচনার গতি অনেকটাই থমকে গেছে। হরমুজ প্রণালী ও লেবানন সংকটসহ ইসরাইল ইস্যু এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে।
তবে মধ্যস্থতাকারী দুই দেশ পাকিস্তান ও কাতারের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনা একটি ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি প্রক্রিয়াও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা এগিয়ে নিতে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি কর্মীদল গঠন করা হয়েছে। এসব দল সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে কাজ করবে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও কঠোর বক্তব্যের মধ্যেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা সংলাপ অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছেন। আলোচনার পর উভয় পক্ষের কারিগরি দল সুইজারল্যান্ডে থেকে পরবর্তী ধাপের আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও জানা গেছে। যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে:
সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে উভয় পক্ষ একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে, যা মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক তদারকি করবে। প্রধান আলোচকরা নিয়মিতভাবে এই কমিটিকে অগ্রগতির প্রতিবেদন দেবেন এবং পারমাণবিক ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত কার্যকরী দলের নেতৃত্ব দেবেন।
এছাড়া সমঝোতা স্মারকের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি গ্রুপও কাজ করবে, যা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ও দেখভাল করবে। উচ্চপর্যায়ের কমিটি ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে, যার ফলে অবিলম্বে আরও কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।
পাশাপাশি ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মধ্যস্থতাকারীদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনে সম্মত হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের পাশাপাশি লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং পাকিস্তান ও কাতার এই ব্যবস্থাকে সহায়তা করবে।
এই সেলের মূল উদ্দেশ্য হবে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রতিশ্রুতি যেন যথাযথভাবে মেনে চলা হয় তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সম্ভাব্য উত্তেজনা, ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ বজায় রাখা হবে।
এই পদক্ষেপকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট প্রশমনে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদিও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনও বেশ কিছু জটিল বিষয় রয়ে গেছে।
কে