দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা দিয়ে হরমুজ প্রণালি ফের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বলে দাবি করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। চুক্তি ঘোষণার তিন দিন পরও গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল তেলবাহী জাহাজ, যেগুলো দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করত।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরান দ্রুত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে কয়েক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
রোববার প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ইরানি তেলবাহী জাহাজও ছিল, যেগুলো দুই মাস পর প্রথমবারের মতো তেল রপ্তানি করেছে।
এখনও প্রণালির দুই পাশে ৫৫০টির বেশি জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে।
ট্রাম্প হরমুজকে ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ বলে দাবি করলেও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রণালি ব্যবহার করতে হলে এখনো দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং ইরানের উপকূলঘেঁষা নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে।
কেন বাড়ছে না জাহাজ চলাচল?
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির পরও জাহাজ মালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবারও সংঘাত শুরু হতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র ড্রোন হামলার নজির নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলায় অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি ঘটনায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
চুক্তি ঘোষণার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছিল, তাদের নৌ অবরোধের কারণে ১৪২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং নির্দেশনা অমান্য করায় নয়টি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা জলমাইন
হরমুজ প্রণালিতে জলমাইনের সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান প্রণালিতে মাইন পেতে রাখার হুমকি দিলেও বাস্তবে তা করেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। তবে নিরাপদ চলাচলের জন্য যে পথনকশা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে চলার কথাও উল্লেখ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, সংঘাত চলাকালে তারা ইরানের মাইন স্থাপনকারী নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইন থাকার সামান্য আশঙ্কাও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ কোনো বীমা প্রতিষ্ঠান এমন ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রণালিকে সম্পূর্ণ মাইনমুক্ত ও নিরাপদ ঘোষণা করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।
নতুন করে ফি আদায়ের বিতর্ক
ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে কোনো অর্থ দিতে হতো না। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান জানিয়ে দেয়, আগের ব্যবস্থা বহাল থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো প্রণালি ব্যবহারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এটি সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতির পরিপন্থী।
তবে ইরানের দাবি, তারা চলাচলের জন্য কোনো শুল্ক নয়, বরং নিরাপদ যাত্রা সমন্বয়ের বিনিময়ে সেবা ফি নিতে চায়। এ লক্ষ্যে মে মাসে দেশটি একটি নতুন কর্তৃপক্ষও গঠন করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে এ ধরনের অর্থ আদায়ের সুযোগ দিতে চাইবে না।
বীমা ব্যয় এখনো উচ্চ
জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ যুদ্ধঝুঁকির বীমা।
যুদ্ধের সময় বীমার ব্যয় এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক ক্ষেত্রে তা জাহাজ পরিচালনার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
যুদ্ধের আগে একবার যাতায়াতের জন্য বীমা ব্যয় জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল। সংঘাত চলাকালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে পৌঁছে যায়।
বর্তমানে ব্যয় কিছুটা কমে ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে নেমে এলেও তা এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ মালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরবে না।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন সংস্থার প্রধান আর্সেনিও দোমিঙ্গেজও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সব নিশ্চয়তা কার্যকর করতে আরও সময় প্রয়োজন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই প্রণালিটি চালু রাখতে আগ্রহী হওয়ায় ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল বাড়তে পারে। যদিও আপাতত হরমুজে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি; জলমাইনের আশঙ্কা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং উচ্চ বীমা ব্যয় এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
/অ