দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীনের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ভিয়েতনামের শীর্ষ নেতা তো লাম। তবে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণের পর আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে শুক্রবার রাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এসব কথা বলেন তিনি।
তো লাম বলেন, ‘আমরা কোনো পক্ষ বেছে নিই না। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।’
দোভাষীর মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা ভালো সম্পর্ক ও সংলাপ বজায় রাখতে পারি, তাহলে সব মতপার্থক্যের সমাধান সম্ভব।’
দক্ষিণ চীন সাগরকে ভিয়েতনামের ভাষায় ‘পূর্ব সাগর’ উল্লেখ করে তো লাম বলেন, ‘চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পূর্ব সাগরের সমস্যা সমাধান—এগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে, পরস্পরবিরোধী নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম।’
দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ অংশে চীনের দাবি ভিয়েতনামে গভীর উদ্বেগের কারণ। ভিয়েতনামও চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা পারাসেল দ্বীপপুঞ্জ এবং স্প্র্যাটলি দ্বীপমালার পুরো অংশের দাবি করে।
এ বিরোধে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও তাইওয়ানও নিজেদের দাবি জানিয়েছে। কৌশলগত এ নৌপথে সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকায় অঞ্চলটি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বড় শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধিনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যেই তো লামের এ মন্তব্য এসেছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতাকে ‘বাস্তবতা’ বলে উল্লেখ করেন।
তো লাম বলেন, ‘নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনা করি না। গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলো যৌথভাবে মোকাবিলার জন্য বড় দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক প্রয়োজন।’
সম্প্রতি একইসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ভিয়েতনামী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তো লাম। তার হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনেও তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছেন।
আঞ্চলিক কূটনীতিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন সতর্ক ও সংযত কূটনৈতিক অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামকে তিনি আরও সক্রিয় ও নমনীয় পথে এগিয়ে নিচ্ছেন।
তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, একজন নেতার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় একদলীয় রাষ্ট্রটি আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে। যদিও এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
৬৮ বছর বয়সী তো লাম ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো থেকে উঠে এসেছেন।
শুক্রবার রাতে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার পর রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দেন তো লাম। এ সম্মেলনে ভিয়েতনামের কোনো পার্টি প্রধানের মূল বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং গবেষকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন আন্তর্জাতিক আইন ও বিধির দুর্বলতা, উন্নয়ন মডেলের সংকট, ধীরগতির অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দেশগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতার মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। আজকের বিশ্বের এই তিন সংকট অনিবার্য বাস্তবতা নয়, যা আমাদের মেনে নিতেই হবে।’
তো লাম আন্তর্জাতিক আইন জোরদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি গড়ে তোলা এবং স্বচ্ছতা ও সংলাপ বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
সাক্ষাৎকারে তো লাম বলেন, ‘ভিয়েতনামের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও চ্যালেঞ্জিং হলেও তা অর্জনে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
২০৪৫ সালের মধ্যে পুরোপুরি উন্নত ও উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে ভিয়েতনাম। এ বছর ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে দ্বিগুণ অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরকে এ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এ লক্ষ্য নির্ধারণের সময় আমরা বর্তমানের সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইনি। তবে সম্ভাব্য কিছু প্রতিকূলতা আমরা আগেই অনুমান করেছিলাম এবং অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেও শিখেছি। তাই আমরা আশাবাদী।’
ইরান সংকটসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে লক্ষ্য পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে তো লাম বলেন, ‘নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও মূল লক্ষ্য এখনো অর্জনযোগ্য। আমাদের উত্তর স্পষ্ট—আমরা এই লক্ষ্য কমাব না। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে দেশের বৃহত্তর উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষাও অপূর্ণ থেকে যাবে।’
/অ