দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দক্ষিণ লেবাননের ছাদ ও ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে নিখুঁতভাবে উড়ে চলা একটি বিস্ফোরকবাহী কোয়াডকপ্টার ড্রোন সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনীর নজরে আসে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন ও মাটির রাস্তার ভেতর দিয়ে লক্ষ্যভেদে এগিয়ে যাওয়া এই ড্রোনটি পরিচালনাকারীর কাছে একটি স্পষ্ট ফার্স্ট-পার্সন ভিউ পাঠাচ্ছিল, যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটি ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক এবং তার আশপাশে অবস্থানরত সেনারা। ছবির ওপরের অংশে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল—‘বোম্ব প্রস্তুত’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি ফাইবার-অপটিক ড্রোন, যা সাম্প্রতিক সময়ে হিজবুল্লাহ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। এই ধরনের ড্রোন ইলেকট্রনিক সিগন্যাল ব্যবহার না করায় সহজে জ্যাম করা যায় না এবং শনাক্ত করাও কঠিন।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ গবেষক বলেন, এসব ড্রোন যোগাযোগ জ্যামিংয়ের বাইরে থাকে এবং কোনো ইলেকট্রনিক সিগন্যাল না থাকায় এগুলোর অবস্থান শনাক্ত করাও প্রায় অসম্ভব।
রোববার প্রকাশিত হিজবুল্লাহর এক ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট আকারের এই কোয়াডকপ্টার ড্রোনটি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, যখন ইসরায়েলি সেনারা এটির উপস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, ওই হামলায় ১৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট ইদান ফুকস নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। পরবর্তীতে আহতদের সরিয়ে নিতে আসা একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারেও হিজবুল্লাহ আরও ড্রোন হামলা চালায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাইবার-অপটিক ড্রোনের মূল শক্তি এটির সহজ প্রযুক্তি। এতে তারযুক্ত সংযোগ ব্যবহার করা হয়, যা সরাসরি পরিচালনাকারীর সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং প্রচলিত রিমোট সিগন্যালের প্রয়োজন হয় না। অতি পাতলা ও হালকা ফাইবার অপটিক কেবল প্রায় ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে এক ইসরায়েলি সামরিক সূত্র জানিয়েছে। এতে ড্রোন পরিচালনাকারী দূরে নিরাপদ অবস্থানে থেকে লক্ষ্যবস্তুর স্পষ্ট ভিডিও দেখতে পারে।
ইসরায়েলি বাহিনী সাধারণত ড্রোন হামলা ঠেকাতে ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে এই ড্রোনগুলোতে কোনো সিগন্যাল না থাকায় সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এক ইসরায়েলি সামরিক সূত্র বলেন, প্রচলিত বাধার কৌশল যেমন নেট ছাড়া এসব ড্রোন ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। এটি স্বল্প প্রযুক্তির কিন্তু অসম যুদ্ধের উপযোগী ব্যবস্থা।
ফাইবার-অপটিক ড্রোন প্রথম বড় পরিসরে দেখা যায় ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে রুশ বাহিনী এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। রাশিয়া এসব ড্রোনের ফাইবার কেবলকে বেস ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করে অপারেটরকে আরও নিরাপদ দূরত্বে রাখে।
হিজবুল্লাহ এসব ড্রোনের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলে তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষমতা থাকলেও এসব কম খরচের ড্রোন অত্যন্ত কার্যকর।
সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক স্যামুয়েল বেন্ডেট বলেন, একজন অভিজ্ঞ পরিচালনাকারীর হাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হতে পারে। এমনকি প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি থাকলেও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
ইসরায়েলের ধারণা, হিজবুল্লাহ এসব বেসামরিক ড্রোন চীন বা ইরান থেকে সংগ্রহ করে এবং সেগুলোকে বিস্ফোরক সংযুক্ত করে হামলায় ব্যবহার করে। তবে চীন পূর্বে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সহায়তায় বিশাল রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল। তবে গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি হামলা ও নিজস্ব ব্যবহারের ফলে তাদের রকেট মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ এখন ড্রোনভিত্তিক অসম যুদ্ধ কৌশলের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, ড্রোন ঠেকাতে নেটসহ কিছু প্রচলিত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এটি পুরোপুরি কার্যকর নয়। বিশেষ করে একসঙ্গে একাধিক ড্রোন হামলা হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে।
এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হিজবুল্লাহ দ্রুত শিখছে এবং সমন্বিত হামলার চেষ্টা করছে, যা আমাদের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
/অ