দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা তার হাতের নাগাল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ছে, মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুদ্ধ ‘স্বল্পস্থায়ী’ হবে—এমন প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা ট্রাম্প অন্যান্য ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তারা হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে। কিন্তু শুক্রবার তার করা ঘোষণা— ‘সামরিকভাবে যুদ্ধ জয় হয়েছে’—বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাস্তবে অনমনীয় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং পুরো অঞ্চল জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
ট্রাম্প, যিনি ‘বোকামিপূর্ণ’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে তিনি এই সংঘাতের ফলাফল বা বার্তা—কোনোটির ওপরই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না। কোনো স্পষ্ট প্রস্থান কৌশল না থাকায় তার প্রেসিডেন্সির উত্তরাধিকার এবং দলের রাজনৈতিক সম্ভাবনা—উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যখন কংগ্রেসে তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে লড়াই করছে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প নিজেই ইরান যুদ্ধ নামের একটি খাঁচা তৈরি করেছেন এবং তিনি বুঝতে পারছেন না এটি থেকে কীভাবে বের হবেন। এটাই এখন তার হতাশার বড় কারণ।’
তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট হামলার মাধ্যমে ইরানের অনেক শীর্ষ নেতাকে নির্মূল করা হয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর বেশিরভাগ অংশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার বহুলাংশে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি অবিসংবাদিত সামরিক সাফল্য।’
ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
গত এক সপ্তাহে ট্রাম্পের কূটনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের আলোচনায় যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষায় নৌবাহিনী মোতায়েনে ন্যাটো সদস্য এবং অন্যান্য বিদেশি অংশীদারদের অনীহা ট্রাম্পকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছে। ট্রাম্প নিজেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখাতে চান না, তাই তার কিছু উপদেষ্টা তাকে পরামর্শ দিয়েছেন দ্রুত একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজে বের করতে এবং সামরিক অভিযানের পরিধি সীমিত করতে। তবে এই যুক্তি ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদের এই অনীহা কেবল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয় নয়, বরং গত ১৪ মাস আগে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঐতিহ্যগত মিত্রদের তুচ্ছজ্ঞান করার একটি প্রতিক্রিয়া।
ইসরায়েলের সঙ্গেও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ‘সাউথ পারস’ গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সমন্বয় করে করা হয়েছে।
ভুল হিসাব-নিকাশ
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রশাসনের ভেতরে এই উপলব্ধি বাড়ছে যে, যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকে আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভুল ধারণা করা। তেহরান তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে পাল্টা আঘাত হানছে এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের পথ—হরমুজ প্রণালী—কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোয় ট্রাম্পের হতাশার চিহ্ন ততই স্পষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি সংবাদমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়েছেন এবং যুদ্ধের ক্ষতি করছে এমন সংবাদ প্রচারের জন্য ভিত্তিহীন ‘দেশদ্রোহিতার’ অভিযোগ তুলেছেন।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) আগের মতো খবরের শিরোনাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, কারণ তিনি এখনও ব্যাখ্যা করতে পারছেন না কেন তিনি দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেলেন এবং এর পরে কী হবে। মনে হচ্ছে তিনি তার প্রচারণার জাদুকরী ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।’